জীবনী মূলক রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জীবনী মূলক রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৩ আগস্ট, ২০১৯

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী মূলক রচনা

robindronath-thakur-biography

ভূমিকা: বাংলাদেশ তথা বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ একটি বিশেষ নাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় সমান প্রতাপের সাথে বাংলা সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সমাসীন রয়েছেন। তাঁর সর্বতোমুখী প্রতিভা, জ্ঞানের গভীরতা তাকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি এসেছিলেন ক্ষণকালের জন্য কিন্তু হয়ে রয়েছেন সর্বকালের। ভারতীয় হয়েও তিনি বিশ্বের দরবারে আসন গেড়ে নিয়েছেন নিজের মর্যাদা ও যোগ্যতা বলে। ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় অভিসিক্ত হয়ে তিনি আছেন সকল মানুষের হৃদয়জুড়ে।

জন্ম: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবারে ৭ মে ১৮৬১ (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮) সালে। তাঁর পিতার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদা দেবী। পিতা-মাতার ১৫ সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্দশতম এবং অষ্টম পুত্র।
শৈশব কৈশোর ও শিক্ষাজীবন: শিশু রবীন্দ্রনাথ বেড়ে উঠেছেন নিতান্তই সহজ সরল ও সাদাসিদেভাবে। একটু বড় হলেই প্রথমে ভর্তি হলেন কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে, কিছুদিন পর চলে গেলেন নর্মাল স্কুলে তারপর বেঙ্গল একাডেমি, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে কিন্তু কোথাও তাঁর মন বসেনি। ঠাকুরবাড়ির রুটিন বাঁধা জীবনে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। অভিভাবকদের নিরালস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি স্কুলের গন্ডি পার হতে পারেননি। স্থির করলেন মেজভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার হবেন। লন্ডনে গিয়ে প্রথমে পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হন। কিন্তু পড়াশুনায় মন না থাকায় তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটে সাহিত্য চর্চায়। দেড় বছর পর ১৯ বছর বয়সে পিতার নির্দেশে শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে দেশে ফিরে আসেন। এখানেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে।


সাহিত্যকর্ম ও সাহিত্য ভাবনা: তাঁর লেখালেখির হাতে খড়ি হয় আট বছর বয়সে। ১৩ বছর বয়সে ‘অমৃতবাজার’ নামে দ্বিভাষিক পত্রিকায় (১৮৭৪) ‘হিন্দুমেলার উপহার’ নামে কবিতাটি প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণা নেই। কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, প্রভৃতি অবিরাম তিনি লিখে গেছেন। কিন্তু মূলত তিনি কবি এবং কবি হিসেবেই তাঁর খ্যাতি সমধিক, কবির মন নতুন সৃষ্টির উন্মাদনায় ব্যাকুল।
তার রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্য: মানসী, সোনার তরী, চৈতালী, গীতাঞ্জলি, বলাকা, পুনশ্চ প্রভৃতি; উপন্যাস-চোখের বালি, ঘরে-বাইরে, যোগাযোগ, চতুরঙ্গ প্রভৃতি; নাটক- বিসর্জন, রক্তকরবী প্রভৃতি; ছোটগল্পগ্রন্থ- গল্পগুচ্ছ, এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম লিখে গেছেন।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অনুভব করা তথা জীবন ও জগতকে উপলব্ধি করার জন্য যে দূরত্ব অতিক্রম করা প্রয়োজন, তাঁর প্রিয়জনের মৃত্যু এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। যার বহিঃপ্রকাশ ‘কড়ি ও কোমল’ এ পাওয়া যায়-
“মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনেমানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”‘কড়ি ও কোমলে’এ কবি আত্ম-প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কিন্তু মানসীতে পেরেছেন। তাই কবি বলেছেন-“মানসীতে যাকে খাড়া করেছি যে মানসেই আছে,সে আর্টিস্টের হাতে রচিত ঈশ্বরের প্রথম অসম্পূর্ণ প্রতিমা।”বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে তাদের বিস্তৃত জমিদারী ছিল। এই জমিদারীর ভার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং বাংলার গ্রাম-গঞ্জ, নদীপথ ঘুরে তিনি যে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তা তাঁর রচিত পরবর্তী সাহিত্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যার প্রমাণ ‘ভানু সিংহের পত্রাবলী’তে পাওয়া যায়- ‘আমি জীবনের কতকাল যে এই নদীর বাণী থেকেই বাণী পেয়েছি মনে হয় সে যেন আমি আমার আগামী জন্মেও ভুলব না।’রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে গানের প্রসঙ্গ আসবেই, তাঁর কবিতা আসলে গানেরই অনুজ সহোদরা। বিভিন্ন সময়ে লেখা বিভিন্ন কবিতার সমন্বয়ে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন পত্রিকা সম্পাদনায়। যেমন- হিতবাদী, সাধনা, বিচিত্রা প্রভৃতি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই তিনি ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ এর সাথেও যুক্ত ছিলেন। বলা চলে, তিনিই বাংলার ভাষায় প্রথম সার্থক ছোটগল্প লিখেছেন। তাঁর গদ্যে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তিনি কেবল বিশ্বমানের ছোটগল্প লিখেছেন, তাই-ই নয়, বিশ্বকে ছোটগল্পের নতুন পথও দেখিয়েছেন, তাই এখানে উদ্ধৃতিযোগ্য-‘নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটানাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশঅন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবেশেষ হয়েও হইল না শেষ’।শুধু কবিতা আর গানই নয় পাশাপাশি লিখেছেন একের পর এক কাব্যনাটক, হাস্যরসাত্মক রচনা। এগুলোর পাশাপাশি প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানের একজন চিত্রশিল্পীও ছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি দুই হাজারের বেশি ছবি এঁকেছেন।




বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন: রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। বিয়ের আগে তার স্ত্রীর নাম ছিল ‘ভবতারিনী’ পরে শ্বশুরবাড়িতে তার নাম বদলে রাখা হয় ‘মৃনালিনী দেবী’। তিনি শিলাইদহে সপরিবারে বহুদিন ছিলেন। পরবর্তীতে কলকাতায় আসার পথে স্ত্রী মৃনালিনী দেবী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্পদিনের মধ্যেই মারা যান। রবীন্দ্রনাথের তিন কন্যা ও দুই পুত্র ছিল।


রাজনীতি ও সমাজকল্যাণ: ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের গোড়ার দিকে রবীন্দ্রনাথ সক্রিয়ভাবে রাজনীতি ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে জড়িত ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের কারণে তিনি বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা, সভা-সমাবেশে যোগদান করতেন। এ সময়ে তাঁর রচিত গান বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বিবেচিত-
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি,চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।এছাড়াও তিনি শিলাইদহে অবস্থানকালে কৃষক ও শ্রমজীবীদের জন্য কাজ করেছেন। ১৯১৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ দমননীতির বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করেন। তাছাড়াও হিন্দু-মুসলিম সংকট, ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজনীতি, বিশ্ব পরিস্থিতি প্রভৃতি নিয়ে তিনি অসংখ্য লেখা লিখেন।


সমাজগঠনমূলক প্রতিষ্ঠান: সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি সমাজ গঠনমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামে একটি আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন। পরবর্তীকালে এটিই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রূপলাভ করে।


পুরষ্কার ও সম্মাননা: তিনি তাঁর বহুকৌণিক কাজের পাশাপাশি অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মান-সম্মাননা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ১৯১৩ সালে ডি. লিট উপাধি দেয়। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও এই উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯১৩ সালে তিনি এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয় ১৯৪০ সালে।



উপসংহার: রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘ আঁশি বছরের জীবনে যেমন সাহিত্য রচনা করেছেন তেমনি মর্যাদা এবং সাফল্যও পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্যিকার অর্থেই প্রতিভাবান। তিনি তার জীবনের শেষ সময়ে এসেও কবিতা লেখা ছাড়েননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণ) মারা যান। রবীন্দ্রনাথের মতো মহাপ্রতিভা সমগ্র বিশ্বেই বিরল। তিনি এক অর্থে মহাসাধক, মহামানব। তিনি ছিলেন সত্য-সুন্দরের কবি। সুন্দরের আরাধনায় তিনি মানবতাকে বিসর্জন দেননি, মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেননি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সব্যসাচী রবীন্দ্রনাথ আমাদের সকলেরই প্রিয় কবি।



/>

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

সম্রাট অশোক জীবনী মূলক রচনা

samrat-ashok-biography


(আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২-৩০০)
প্রতিবেশী দুটি সাম্রাজ্য মগধ এবং কলিঙ্গ। মগধ অপেক্ষাকৃত বড়, তার শক্তিও তুলনায় বেশি। তবুও মগধ সম্রাটের মনে শান্তি নেই। প্রতিবেশী এক শত্রুকে রেখে কি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়!
দুই পক্ষের সৈন্যবাহিনীই শক্তিশালী। কিন্তু মগধের সৈন্যরা অনেক বেশি যুদ্ধপটু আর কৌশলী। কলিঙ্গের সৈন্যরা বীর বীক্রমে লড়াই করেও পরাজিত হলো। আহত আর নিহত সৈন্যে ভরে উঠল যুদ্ধক্ষেত্র। রক্তাক্ত হলো সমস্ত প্রান্তর। কলিঙ্গরাজ নিহত হলেন।
বিজয়ী মগধ সম্রাট হাতির পিঠে চেপে যেতে যেতে দেখলেন তার দুপাশে ছড়িয়ে রয়েছে কত অসংখ্য মৃতদেহ। কত আহত সৈনিক। কেউ আর্তনাদ করছে, কেউ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে চিৎকার করছে। কেউ সামান্য একটু পানির জন্য ছটফট করছে। আকাশে মাংসের লোভে শকুনের দল ভিড় করছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে সম্রাট বিষণ্ন হয়ে গেলেন। অনুভব করলেন তার সমস্ত অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে নিজের তাঁবুতে ফিরে দেখলেন শিবিরের সামনে দিয়ে চলেছে এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী।
সন্ন্যাসী বললেন, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের সেবা করতে চলেছি।
মুহূর্তে অনুতাপের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল সম্রাটের হৃদয়। সম্রাটের অন্তরে জ্বলে উঠল নতুন এক প্রজ্ঞার আলোক। তিনি শপথ করলেন আর যুদ্ধ নয়, আর হিংসা নয়, ভগবান বুদ্ধের করুণায় আলোয় অহিংসা মন্ত্রে ভরিয়ে দিতে হবে সমগ্র পৃথিবী।
একদিন যিনি ছিলেন উন্মত্ত দানব-এবার হলেন শান্তি আর অহিংসার পূজারি প্রিয়দর্শী অশোক।
খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২ সালে বিন্দুসারের মৃত্যুর পর পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের অধিকার নিয়ে বিবাদ শুরু হচ্ছিল। বিন্দুসারের জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম সুধীন, দ্বিতীয় পুত্র অশোক। সুধীন ছিলেন উদ্ধত বিলাসী। অশোক ছিলেন হৃদয়হীন নিষ্ঠুর প্রকৃতির। ভাইকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকার করলেন। অশোকের পরের ভাইয়ের নাম ছিল তিষ্য। অশোক অনুভব করলেন তিনি জ্যেষ্ঠ ভাইকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছেন, এতে রাজ্যের অনেকেই ক্ষুব্ধ। তার ওপর যদি তিষ্যকে হত্যা করেন প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে। তাই তাকে পাঠিয়ে দিলেন তক্ষশীলায় সেখানকার শাসনকর্তা করে।
সর্বকনিষ্ঠ ভাইয়ের নাম ছিল বীতাশোক। ছেলেবেলা থেকেই বীতাশোক ছিলেন রাজ ঐশ্বর্য সুখভোগ বিষয়ে উদাসীন। সিংহাসনের এই অধিকার নিয়ে ভাইদের মধ্যের বিবাদ, হানাহানি তাকে আরও বিষণ্ন করে তুলল। সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তির আশায়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী গিরিদত্তের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে বৌদ্ধসঙ্গে ভিক্ষু হয়ে গেলেন।

অশোক সিংহাসনে আরোহণ করে প্রথম কয়েক বছর নিজের অধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন। যারা তার আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকার করল, তিনি তাদের নির্মমভাবে হত্যা করলেন। তার এই নৃশংসতার জন্য লোক তাকে চণ্ডাশোক বলত।
কলিঙ্গ যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রেম করুণায় পূর্ণ হয়ে উঠল তার হৃদয়। চণ্ডাশোক অশোক রূপান্তরিত হলেন ধর্মাশোক অশোকে।
অশোক ঘোষণা করলেন আর যুদ্ধ নয়, এবার হবে ধর্ম বিজয়। ভ্রাতৃত্ব প্রেম, করুণার মধ্যে দিয়ে অপরকে জয় করতে হবে। শুধুমাত্র নির্দেশ প্রদান করেই নিজের কর্তব্য শেষ করলেন না। এত দিন যে রাজসুখ বিলাস ব্যসনের সাথে পরিচিত ছিলেন তা পরিত্যাগ করে সরল পবিত্র জীবনযাত্রা অবলম্বন করলেন।
তিনি সকল প্রতিবেশী দেশের রাজাদের কাছে দূত পাঠিয়ে ঘোষণা করেছিলেন তিনি তাদের সাথে মৈত্রী, প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান। সকলে যেন নির্ভয়ে আপন রাজ্য শাসন করেন। এমনকি সম্রাট অশোক তার উত্তরাধিকারীদের কাছেও দেশ জয়ের জন্য যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি তাদের উপদেশ দিতেন অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, প্রেম করুণা সহৃদয়তার মধ্যে দিয়েই মানুষকে জয় কর। এই জয়কে সম্রাট অশোক বলতেন ধর্ম বিজয়।
অশোক বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। প্রধানত তারই প্রচেষ্টায় পূর্ব ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার লাভ করে। তবে তিনি ধর্ম প্রচারের জন্য শুধু যে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচারকদের পাঠাতেন তাই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্তম্ভ পর্বত শিলাখণ্ডের ওপর বিভিন্ন উপদেশ উৎকীর্ণ করে দিতেন যাতে সেই অনুশাসন পাঠ করে প্রজারা তা পালন করতে পারে। অশোক এসব অনুশাসনে যে সমস্ত উপদেশ দিয়েছেন তার সাথে বৌদ্ধদের অষ্টমার্গের বিশেষ মিল নেই।
অশোকের নির্দেশে বহু পথ নির্মাণ করা হলো। এই সমস্ত পথের দুপাশে প্রধানত বট এবং আম গাছ পোঁতা হতো। যাতে মানুষ ছায়ায় পথ চলতে পারে। ক্ষুধার সময় গাছের ফল খেতে পারে। প্রতি আট ক্রোশ অন্তর পথের ধারে কূপ খনন করা হয়েছিল।
শুধু মানুষ নয়, পশুদের প্রতিও ছিল তার গভীর মমতা। তিনি সমস্ত রাজ্যে পশুহত্যা শিকার নিষিদ্ধ করেছিলেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম পশুদের জন্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেছিলেন। সর্বজীবের প্রতি করুণায় এমন দৃষ্টান্ত জগতে বিরল।
অশোক বৌদ্ধ হলেও অন্য কোনো ধর্মের প্রতি তার কোনো বিদ্বেষ ছিল না। সকলেই যে যার ধর্ম পালন করত। একটি শিলালিপিতে তিনি লিখেছেন, নিজের ধর্মের প্রতি প্রশংসা অন্যের ধর্মের নিন্দা করা উচিত নয়। পরস্পরের ধর্মমত শুনে তার সারবস্তু, মূল সত্যকে গ্রহণ করা উচিত।
ধর্মচরণে অধিক মনোযোগী হলেও রাজ্যশাসনের ব্যাপারে সামান্যতম দুর্বলতা দেখাননি। পিতা-পিতামহের মতো তিনিও ছিলেন সুদক্ষ প্রশাসক। সুবিশাল ছিল তার রাজ্যসীমা। তিনি শাসনকাজের ভার উপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতেই দিতেন এবং প্রয়োজনমতো তাদের  নির্দেশ দিতেন।
সম্রাট অশোক তার সমস্ত জীবন প্রজাদের সুখ কল্যাণে তাদের আত্মিক উন্নতির জন্য ব্যয় করেছিলেন। তবুও তার অন্তরে দ্বিধা ছিল। একজন সম্রাট হিসেবে তিনি কি তার যথার্থ কর্তব্য পালন করছেন? একদিন গুরুকে প্রশ্ন করলেন, গুরুদেব, সর্বশ্রেষ্ঠ দান কী?
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উত্তর দিলেন, সর্বশ্রেষ্ঠ দান ধর্মদান। একমাত্র ধর্মের পবিত্র আলোতেই মানুষের অন্তর আলোকিত হয়ে উঠতে পারে। তুমি সেই ধর্মদান কর।
গুরুর আদেশ নতমস্তকে গ্রহণ করলেন অশোক। তারই অনুপ্রেরণায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল বৌদ্ধ ধর্মের সুমহান বাণী। কিন্তু যেখানে বৌদ্ধ ধর্মের কোনো আলো গিয়ে পৌঁছায়নি, কে যাবে সেই দাক্ষিণাত্যের, সুদূর সিংহলে?
শুধু সিংহল নয়, ভারতবর্ষের বাইরে আরও বহু দেশে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য লোক পাঠালেন অশোক। তিনি চেয়েছিলেন তার অহিংসা ও প্রেমের বাণী হিন্দু বৌদ্ধ ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে।
কিন্তু সেকালের ব্রাহ্মণরা তার এই বৌদ্ধ ধর্মপ্রীতিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। উপরন্তু তার এক রানিও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। তিনি ব্রাহ্মণদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্র করতে আরম্ভ করলেন। প্রথমে অশোক কোনো কিছুই জানতেন না। কিন্তু কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর তার কাছে সমস্ত সংবাদ প্রকাশ করে দিল।

প্রচণ্ড মর্মাহত হলেন অশোক। যে আদর্শকে এত দিন তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে প্রচার করেছেন আজ নিজের স্ত্রী তার বিরোধিতা করছে। মনের দুঃখে রাজ্যপাট ত্যাগ করে বৌদ্ধবিহারে গিয়ে আশ্রয় নিলেন।
অশোকের অবর্তমানে তার সিংহাসনে বসলেন তার নাতি সম্পতি। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি খুব একটা অনুরক্ত ছিলেন না। অশোকের আমলে ধর্মপ্রচারের জন্য প্রজাদের কল্যাণের জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হতো, সম্পতি সেই ব্যয় কমিয়ে দিলেন।
একদিন যিনি ছিলেন সমগ্র ভারতের সম্রাট, আজ তিনি রিক্ত। বুঝতে পারলেন পৃথিবীতে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এবার বিদায় নিতে হবে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বেদনাহত চিত্তে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন নৃপতি মহামতি অশোক।


শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯

সত্যজিৎ রায় জীবনী মূলক রচনা

sottojit-roy-biography

জন্ম, ছেলেবেলা ও পড়াশোনা
সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে এক বিদগ্ধ এবং সাংস্কৃতিক ঋদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।তাঁর পিতা সুকুমার রায়(১৮৮৭-১৯২৩) ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর বড় ছেলে।সুকুমার রায় ছিলেন লেখক, সম্পাদক ও আলোকচিত্রী। এছাড়া তিনি "Royal Photographic Society of Great Britain" এর ফেলো ছিলেন। তিনি ইংল্যান্ডে প্রিন্টিং টেকনোলজির উপর পড়াশোনা করেছেন এবং পরে পারিবারিক ব্যবসায়ে যোগ দেন।

সত্যজিৎ এর পিতামহ অর্থাৎ সুকুমার রায়ের পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন প্রখ্যাত লেখক, শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর, আলোকচিত্রী, ব্লক ডিজাইনার এবং শিশুতোষ পত্রিকা "সন্দেশ" এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক। বেহালা বাদক হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল।তিনি ভারতের অন্যতম সেরা প্রেস "U. Ray & Sons" এর প্রতিষ্ঠাতা।তিনি মারা যান সত্যজিৎ এর জন্মের ৬ বছর আগে।

সত্যজিৎ এর মা সুপ্রভা রায় ছিলেন সংগীত শিল্পী ও একই সঙ্গে হস্তশিল্পে পারদর্শি।
১৯২৩ সালে সত্যজিৎ এর পিতা সুকুমার রায় মারা যান।তখন সত্যজিৎ এর বয়স মাত্র তিন বছর।এর তিন বছর পর প্রিন্টিং এর ব্যবসা তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায় এবং সত্যজিৎ ও তাঁর মা'কে তাদের নিজস্ব বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়।তাঁরা সত্যজিৎ এর মামা বাড়িতে চলে যান।তাঁর মা সুপ্রভা রায় সূচি কর্মের মাধ্যমে গৃহস্থালির খরচ নির্বাপন করতেন।এখানেই সত্যজিৎ বিজয়া(পরবর্তীতে সত্যজিৎ এর স্ত্রী) এর সাথে পরিচিত হন।

সত্যজিৎ ৮ বছর বয়সে বালিগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়ে(Ballygunj Government School)ভর্তি হন।এর আগে তাঁর পড়াশোনা চলছিল তাঁর মায়ের কাছে। ছাত্র হিসেবে সত্যজিৎ মাঝারি মানের ছিলেন।
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁর চলচ্চিত্র প্রেম শুরু হয়।নিয়মিত হলিউড এর খবর পড়তেন।এমনকি টুকিটাকি খবর ও বাদ যেতনা।"Picturegoer" এবং "Photoplay" এর মতো বিখ্যাত ম্যাগাজিনগুলো তিনি নিয়মিত পড়তেন।এছাড়া "Western classical music" ছিল তাঁর আরেকটি আগ্রহের বিষয়।১৫ বছর বয়সের দিকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।
মায়ের পীড়াপীড়িতে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন।প্রথম দুই বছর বিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করলেও তৃ্তীয় বর্ষে তিনি অর্থনীতি নেন।কারন এক নিকটাত্মীয় তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে অর্থনীতিতে গ্রাজুয়েট করলে তাঁকে চাকরি দিবেন।কলেজে পড়ার সময়েও তিনি চলচ্চিত্র দেখা এবং নিজস্ব গ্রামোফোনে "Western Classical Music" শোনা চালিয়ে যান।
১৮ বছর বয়সে ১৯৩৯ সালে তিনি গ্রাজুয়েট করেন।এবং পড়াশোনা ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।যদিও কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষন ছিলনা তবুও তিনি বানিজ্যিক চিত্রকর (Commercial Artist) হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।ছবি আঁকায় তাঁর সহজাত প্রতিভা এবং আগ্রহ ছিল।তাঁর মায়ের অবশ্য মনে হয়েছিল যে চাকরি করার পক্ষে সত্যজিৎ এর বয়স অনেক কম।তাই তিনি সত্যজিৎ কে শান্তিনিকেতনে পেইন্টিং এর উপর পড়াশোনা করার উপদেশ দেন।প্রথমে আপত্তি করলেও পড়ে সত্যজিৎ অবশ্য মেনে নেন

কর্মজীবন
১৯৪৩ এর এপ্রিলে তিনি ব্রিটেন ভিত্তিক বিজ্ঞাপনী সংস্থা D.J.Keymer এ মাসিক ৮০ রুপি বেতনে জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার হিসেবে যোগদান করেন।পরবর্তী ১৩ বছর(যত দিনে পথের পাঁচালী সফলতা পায় এবং তিনি পুরোদস্তুর চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন) তিনি এখানেই কর্মরত ছিলেন।
এর পরবর্তী ৩৭ বছর শুধুই চলচ্চিত্র নির্মান করেন।১ বছরে ১ ছবি এই ছিল তাঁর মূলনীতি।প্রচন্ড কাজের চাপে ১৯৮০ এর মধ্যমভাগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর উপন্যাস অবলম্বনে "ঘরে বাইরে"(১৯৮৪) ছবিটি তাঁর আবার চলচ্চিত্রাঙ্গনে ফিরে আসার প্রথম কাজ।শুটিং এর সময় তিনি দুইবার হার্ট এটাক এর শিকার হন এবং তাঁর ছেলে সন্দীপ রায় ছবিটির কাজ শেষ করেন

পরবর্তী চার বছর অসুস্থতার কারনে তিনি চলচ্চিত্র থেকে দূরে ছিলেন।১৯৮৯ তে তিনি "গণশত্রু" এর অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।এই সিরিজের পরবর্তী ছবিগুলো ছিল "শাখা- প্রশাখা"(১৯৯০) এবং "আগন্তুক"(১৯৯১)।তিন ছবির এই সিরিজটিই তাঁর জীবনের শেষ সিরিজ।

মহাপ্রয়াণ
১৯৯২ সালের ২৩ শে এপ্রিল সত্যজিৎ রায় মৃত্যুবরন করেন।


সত্যজিৎ এর পাওয়া পুরস্কার এর তালিকা (আংশিক)
সালঃ সালঃ ১৯৫৮
পদ্মশ্রী(Padmashree), India ১৯৬৫
পদ্মভূষন(Padmabhushan), India
সালঃ ১৯৬৭ম্যাগসেসে পুরস্কার( Magasaysay Award), Manila
সালঃ ১৯৭১
Star of Yugoslavia
সালঃ ১৯৭৩
Doctor of Letters, Delhi University
সালঃ ১৯৭৪
D. Litt., Royal College of Arts, London
সালঃ ১৯৭৬
পদ্মবিভূষন( Padmabibhushan), India
সালঃ ১৯৭৮
D. Litt., Oxford University
Special Award, Berlin Film Festival
Deshikottam, Visva-Bharati University, India
সালঃ ১৯৭৯
Special Award, Moscow Film Festival
সালঃ ১৯৮০
D. Litt., Burdwan University, India
D. Litt., Jadavpur University, India
সালঃ ১৯৮১
Doctorate, Benaras Hindu University, India
D. Litt. , North Bengal University, India
সালঃ ১৯৮২
Hommage à Satyajit Ray, Canes Film Festival
Special Golden Lion of St. Mark, Venice Film Festival
বিদ্যাসাগর পুরস্কার(Vidyasagar Award), Govt. of West Bengal
সালঃ ১৯৮৩
Fellowship, The British Film Institute
সালঃ ১৯৮৫
D. Litt., Calcutta University, India
দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার (Dadasaheb Phalke Award), India
Soviet Land Nehru Award
সালঃ ১৯৮৬
Fellowship, Sangeet Natak Academy, India
সালঃ ১৯৮৭
Légion d'Honneur, France
D. Litt., Rabindra Bharati University, India
সালঃ ১৯৯২
অস্কার- আজীবন পুরস্কার(Oscar for Lifetime Achievement), USA
ভারতরত্ন (Bharatratna), India

এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার এর তালিকা।তাঁর জীবনের সব পুরস্কারের তালিকা এত বড় যে দিলে লেখা খুব বড় হয়ে যাবে (হয়ত বড় লেখা দেখে আপনারা পড়বেনই না) তাই এই মহাগুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের তালিকাটি দিলাম।
চলচ্চিত্রে আগ্রহের ইতিহাস
যেসব কারন সত্যজিৎ রায়কে চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে উৎসাহী করেছে এর মধে উল্লেখযোগ্য হল জ্যঁ রেঁনোয়ার (বিশ্ববিখ্যাত ফরাসী পরিচালক) এর সান্নিধ্যলাভ এবং তাঁর "দ্য রিভার" ছবির শুটিং প্রত্যক্ষ ভাবে দেখা( তিনি এই ছবিটির কিছু অংশের শুটিং কলকাতায় করেছিলেন)।এছাড়া ১৯৫০ সালে চাকরি সূত্রে লন্ডনে ৫ মাস অবস্থান করেছিলেন যা ছিল তাঁর চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।লন্ডনে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি প্রায় ১০০ চলচ্চিত্র দেখেন, পরিচিত হন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা লিন্ডসে এন্ডারসন, চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ পেনেলোপি হাষ্টন ও গ্যাবিন ল্যাম্বটিরসাথে।এ সময়েই তিনি বিশ্ববিখ্যাত ইতালিয়ান পরিচালক ভিত্তোরিও ডি সিকা নির্মিত নিওরিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্র "দ্য বাইসাইকেল থিফ"(১৯৪৮) দেখে বিশেষভাবে মুগ্ধ হন এবং বিভুতিভূষন বন্দোপাধ্যায় এর উপন্যাস "পথের পাঁচালী" অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মান করার সিদ্ধান্ত নেন।
সত্যজিৎ এর প্রভাব
দেশ বিদেশের বহু বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা সত্যজিৎ এর চলচ্চিত্রশৈলীর অনুসারী।তাঁরা বিভিন্নভাবে সত্যজিৎ রায়ের কাজ দ্বারা প্রভাবিত।এই দলে ভারতের অপর্ণা সেন,দীপা মেহতা, ঋতুপূর্ণ ঘোষ ও গৌতম ঘোষ;বাংলাদেশের তারেক মাসুদ ও তানভীর মোকাম্মেল; এমনকি ইরাকের আব্বাস কিয়ারোস্তামি এবং ফ্রান্সের জঁ লুক গদারের মত পরিচালক পর্যন্ত রয়েছেন।কেউ কেউ আবার সত্যজিৎ এর ছবি বা ছবির অংশবিশেষ অনুকরণ করেছেন।কখনো কখনো তাঁর নির্মিত কোন একটি ছবির নির্দিষ্ট একটি চরিত্র অবলম্বনে নতুন কাহিনী তৈ্রি করে ছবি নির্মান করেছেন।

সত্যজিৎ এর পরিচালিত চলচ্চিত্রের তালিকা
এখানে সত্যজিৎ রায়ের সবগুলো ছবির নাম দেয়া হলো।ছবিগুলোর নাম, "মুক্তির সাল-ছবির নাম-দৈ্র্ঘ্য-প্রকার" এই ফরম্যাট এ দেয়া হলো।
1955 পথের পাঁচালী (Song of the Little Road), ১১৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1956 অপরাজিত (The Unvanquished), ১১৩ মিনিট.., সাদাকালো।
1958 পরশ পাথর (The Philosopher's Stone), ১১১ মিনিট.., সাদাকালো।
1958 জলসা ঘর (The Music Room), ১০০ মিনিট.., সাদাকালো।
1959 অপুর সংসার (The World of Apu), ১০৬ মিনিট.., সাদাকালো।
1960 দেবী (The Goddess), 93 min., সাদাকালো।
1961 তিন কন্যা (Three Daughters), পোষ্টমাস্টার (৫৬ মিনিট.);মনিহারা (৬১ মিনিট..); সমাপ্তি (৫৬ মিনিট.) (Two Daughters, পোষ্টমাস্টার(৫৬ মিনিট.); সমাপ্তি (৫৬ মিনিট.), সাদাকালো।
1961 Rabindranath Tagore, Documentary, ৫৪ মিনিট., সাদাকালো।
1962 কাঞ্চনজংঘা, ১০২ মিনিট.., Color
1962 অভিযান (The Expedition), ১৫০ মিনিট.., সাদাকালো।
1963 মহানগর (The Big City), ১৩১ মিনিট.., সাদাকালো।
1964 চারুলতা (The Lonely Wife), ১১৭ মিনিট.., সাদাকালো।
1964 Two, Short, ১৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1965 কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (The Coward and the Holy Man), ৭৪ + ৬৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1966 নায়ক (The Hero), ১২০ ., সাদাকালো।
1967 চিড়িয়াখানা (The Zoo), ১২৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1968 গুপি গাইন বাঘা বাইন (Adventures of Goopy and Bagha), ১৩২ মিনিট.., সাদাকালো এবং আংশিক রঙিন।
1969 অরণ্যের দিন রাত্রি (Days and Nights in the Forest), ১১৫ মিনিট..,সাদাকালো।
1970 প্রতিদ্বন্দী (The Adversary), ১১০ মিনিট.., সাদাকালো।
1971 সীমাবদ্ধ (Company Limited), ১১২ মিনিট.., সাদাকালো।
1971 সিকিম,(Sikkim), Documentary, ৬০ মিনিট.., সাদাকালো।
1972 The Inner Eye, Documentary, ২০ মিনিট.., রঙিন।
1973 অশনি সংকেত (Distant Thunder), ১০১ মিনিট.., রঙিন।
1974 সোনার কেল্লা (The Fortress), ১২০ মিনিট.., রঙিন।
1975 জন অরণ্য (The Middleman), ১৩১ মিনিট.., সাদাকালো।
1976 বালা(Bala), Documentary, ৩৩ মিনিট.., রঙিন।
1977 শতরঞ্জ কি খিলাড়ী (The Chess Players) ১১৩ মিনিট..রঙিন।
1978 জয় বাবা ফেলুনাথ (The Elephant God), ১১২ মিনিট., রঙিন।
1980 হীরক রাজার দেশে (Kingdom of Diamonds), ১১৮ মিনিট.., রঙিন।
1980 পিকু (Pikoo's Day), Short, ২৬ মিনিট.., রঙিন।
1981 সদ্ গতি (The Deliverance), ৫২ মিনিট.., রঙিন।
1984 ঘরে বাইরে (Home and the World), ১৪০ মিনিট.., রঙিন।
1987 সুকুমার রায়(Sukumar Ray), Documentary, ৩০ মিনিট.., রঙিন।
1989 গণ শত্রু (Enemy of the People), ১০০ মিনিট.., রঙিন।
1990 শাখা প্রশাখা (Branches of the Tree), ১২১ মিনিট.., রঙিন।
1991 আগন্তুক (The Stranger), ১২০ মিনিট., রঙিন।
1955 পথের পাঁচালী (Song of the Little Road), ১১৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1956 অপরাজিত (The Unvanquished), ১১৩ মিনিট.., সাদাকালো।
1958 পরশ পাথর (The Philosopher's Stone), ১১১ মিনিট.., সাদাকালো।
1958 জলসা ঘর (The Music Room), ১০০ মিনিট.., সাদাকালো।
1959 অপুর সংসার (The World of Apu), ১০৬ মিনিট.., সাদাকালো।
1960 দেবী (The Goddess), 93 min., সাদাকালো।
1961 তিন কন্যা (Three Daughters), পোষ্টমাস্টার (৫৬ মিনিট.);মনিহারা (৬১ মিনিট..); সমাপ্তি (৫৬ মিনিট.) (Two Daughters, পোষ্টমাস্টার(৫৬ মিনিট.); সমাপ্তি (৫৬ মিনিট.), সাদাকালো।
1961 Rabindranath Tagore, Documentary, ৫৪ মিনিট., সাদাকালো।
1962 কাঞ্চনজংঘা, ১০২ মিনিট.., Color
1962 অভিযান (The Expedition), ১৫০ মিনিট.., সাদাকালো।
1963 মহানগর (The Big City), ১৩১ মিনিট.., সাদাকালো।
1964 চারুলতা (The Lonely Wife), ১১৭ মিনিট.., সাদাকালো।
1964 Two, Short, ১৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1965 কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (The Coward and the Holy Man), ৭৪ + ৬৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1966 নায়ক (The Hero), ১২০ ., সাদাকালো।
1967 চিড়িয়াখানা (The Zoo), ১২৫ মিনিট.., সাদাকালো।
1968 গুপি গাইন বাঘা বাইন (Adventures of Goopy and Bagha), ১৩২ মিনিট.., সাদাকালো এবং আংশিক রঙিন।
1969 অরণ্যের দিন রাত্রি (Days and Nights in the Forest), ১১৫ মিনিট..,সাদাকালো।
1970 প্রতিদ্বন্দী (The Adversary), ১১০ মিনিট.., সাদাকালো।
1971 সীমাবদ্ধ (Company Limited), ১১২ মিনিট.., সাদাকালো।
1971 সিকিম,(Sikkim), Documentary, ৬০ মিনিট.., সাদাকালো।
1972 The Inner Eye, Documentary, ২০ মিনিট.., রঙিন।
1973 অশনি সংকেত (Distant Thunder), ১০১ মিনিট.., রঙিন।
1974 সোনার কেল্লা (The Fortress), ১২০ মিনিট.., রঙিন।
1975 জন অরণ্য (The Middleman), ১৩১ মিনিট.., সাদাকালো।
1976 বালা(Bala), Documentary, ৩৩ মিনিট.., রঙিন।
1977 শতরঞ্জ কি খিলাড়ী (The Chess Players) ১১৩ মিনিট..রঙিন।
1978 জয় বাবা ফেলুনাথ (The Elephant God), ১১২ মিনিট., রঙিন।
1980 হীরক রাজার দেশে (Kingdom of Diamonds), ১১৮ মিনিট.., রঙিন।
1980 পিকু (Pikoo's Day), Short, ২৬ মিনিট.., রঙিন।
1981 সদ্ গতি (The Deliverance), ৫২ মিনিট.., রঙিন।
1984 ঘরে বাইরে (Home and the World), ১৪০ মিনিট.., রঙিন।
1987 সুকুমার রায়(Sukumar Ray), Documentary, ৩০ মিনিট.., রঙিন।
1989 গণ শত্রু (Enemy of the People), ১০০ মিনিট.., রঙিন।
1990 শাখা প্রশাখা (Branches of the Tree), ১২১ মিনিট.., রঙিন।
1991 আগন্তুক (The Stranger), ১২০ মিনিট., রঙিন।

সাহিত্যকর্ম

সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রের মত সাহিত্য রচনায়ও সমান পারদর্শী ছিলেন।কিন্তু চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর অনবদ্য অবদান তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা করেছে। হয়তো এ কারনেই তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা কম করা হয়।তাঁর সাহিত্যগুলো মূলত তার পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত শিশুতোষ "সন্দেশ" পত্রিকার জন্য লেখা, যা পরবর্তীতে বই আকারেও বের হয়েছে।উল্লেখ্য "সন্দেশ"পত্রিকাটি মাঝখানে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ এটি আবারো চালু করেন।সত্যজিৎ এর লেখাগুলো ছিল প্রধানত কিশোর রচনা।তবে তা সব বয়সী পাঠকই পড়তেন এবং এখনো পড়েন।বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা চরিত্র "ফেলুদা" সত্যজিৎ এর এক আশ্চর্য সৃষ্টি।এছাড়া তিনি বিজ্ঞানকল্পকাহিনী ও লিখেছেন।এ ক্ষেত্রে তাঁর আরেকটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় চরিত্র "প্রফেসর শঙ্কু"।এছাড়া তিনি অনেক ছোটগল্প লিখেছেন।করেছেন আনুবাদও।উল্লেখ্য যে এসব বই এর প্রচ্ছদ এবং ভিতরের ছবি সব তাঁর নিজের হাতে আঁকা।চলচ্চিত্র নির্মান এবং শুটিং নিয়েও তিনি লিখেছেন কিছু বই।এগুলো হচ্ছে, "আওয়ার ফিল্মস,দেয়ার ফিল্মস", "বিষয়ঃ চলচ্চিত্র", "একেই বলে শুটিং" ইত্যাদি।এছাড়া নিজের ছেলেবেলা নিয়েও তিনি বই লিখেছেন, "যখন ছোট ছিলাম"।

সত্যজিৎ সম্পর্কে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের করা কয়েকটি মন্তব্যঃ

১৯৮৭ সালে তৎকালীন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিঁতেরা কলকাতায় এসে সত্যজিৎ কে " লিজিয়ন অব অনার" এ ভূষিত করে বলেন-
"ভারতের সাংস্কৃতিক জগতে সত্যজিৎ রায় এক অবিস্মরনীয় ব্যক্তিত্ব।চলচ্চিত্র জগতে এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ।তাঁর মতো মহান ব্যক্তিকে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ সন্মানে ভূষিত করতে পেরে আমি ও আমার দেশ্ বাসী আজ সন্মানিত বোধ করছি"।
১৯৯২ সালে তাঁকে অস্কার এ আজীবন সন্মাননা জানিয়ে বলা হয়,- "In recognition of his rare mastery of the art of motion pictures and for his profound humanitarian outlook,which has had an indelible influence on filmmakers and audiences throughout the world".
অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী ড.অমর্ত্য সেন বলেন-"The work of Ray presents a remarkably insightful understanding of the relations between cultures, and his ideas remain pertinent to the great cultural debates in the contemporary world,not least in India.
"রশোমন"(১৯৫০) খ্যাত বিশ্বখ্যাত জাপানী পরিচালক আকিরা কুরোশাওয়া বলেছেন-
"Not to have seen the cinema of Ray means existing in the world without seeing the sun or the moon".
বিখ্যাত পরিচালক Martin scorsese বলেছেন,
"Ray's magic,the simple poetry of his images and their emotional impact,will always stay with me...His work is in the company of that of living contemporaries like Ingmar Bergman,Akira Kurosawa and Federico Fellini"
শেষ কথা
সত্যজিৎ রায় কে নিয়ে লিখলে কয়েকটা মহাকাব্য হয়ে যাবে তবুও শেষ হবেনা তাকে নিয়ে লেখা।এক জীবনে শেষ করা যাবেনা তাঁকে নিয়ে গবেষনা। এমনই গভীর তাঁর বিদগ্ধতা, এতই বৈচিত্রময় তাঁর জীবনাচারণ। এই লেখায় আমি শুধু তাঁর কিছু তথ্য উপস্থাপন করেছি মাত্র।কোন বিশ্লেষন করিনি। তবে তাঁকে নিয়ে আমার আরো লেখার ইচ্ছা আছে। জানি লিখব শেষ করতে পারবোনা। মহীরুহের ডাল-পালা আর পাতার সংখা কি গুনে শেষ করা যায়? সত্যজিৎ যে মহীরুহ!


/>

শনিবার, ৬ জুলাই, ২০১৯

শক্তি চট্টোপাধ্যায় জীবনী মূলক রচনা

shakti-chottpadhay-biography

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :– জীবানন্দ পরবর্তী বাংলা  সাহিত্যর অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় । ১৯৩৩ সালে ২৫ নভেম্বর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বহরুতে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হয় । তার পিতা বামানাথ চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা কমলাদেবী । কবির শৈশবের কিছুটা অংশ কেটেছে তার মামার বাড়িতে । চল্লিশের দশকে তিনি কলকাতার বাগবাজারে মামার বাড়িতে থাকতেন ।


ছাত্রজীবন :– হাতের কাজের প্রতি আগ্রহ থাকায় ছোটোবেলায় কবি ভরতি হন কাশিমবাজার পলিটেকনিক স্কুলে । ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন তিনি । অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় হরিপদ কুশারীর প্রভাবে কবি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন । তিনি " রূপচাঁদ পক্ষী " ছদ্ম নামে কবিতা লেখা শুরু করেন । স্কুলে পড়াকালীনই শক্তি চট্টোপাধ্যায় " নবোদয় " নামের একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করেন । স্কুলের পাঠ সমাপ্ত করে এরপর তিনি বাংলা সাহিত্যে অনাস নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভরতি হন । কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাত্র রাজনীতির কারনেই ডিসকলেজিয়েট হন । ফলে কলেজের পাঠ তার শেষ করা হয়নি । পরবর্তীকালে কবি বুদ্ধদেব বসুর প্রেরনায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ভরতি হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানের পরাতেও তিনি ইতি টানেন ।


কর্মজীবন :– কবির প্রথম চাকরি ছিল " ক্লারিয়ণ " নামক এক বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে কপিরাইটার কাজ । পরবর্তীকালে তিনি " ভারবি " প্রকাশনা সংস্থায় যোগ দেন । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরিকল্পনাতেই এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে " শ্রেষ্ট কবিতা " সিরিজটি প্রকাশিত হতে শুরু করে । এই সময়ে বন্ধু পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় একটি টিউটোরিয়াল হোম খোলেন তিনি । পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীতে তিনি অতিথি অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত ছিলেন ।


সাহিত্যকর্ম :– বুদ্ধদেব বসুর " কবিতা " পত্রিকার প্রকাশিত হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের " যম " কবিতাটি । এটিই তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তিনি তার " কৃত্তিবাস " পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন  এবং এই পত্রিকার অন্যতম প্রধান কবি হয়ে ওঠেন ।

[] ধীরে ধীরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পঞ্চাশের দশকের একজন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন । কবিতা রচনাই তার একমাত্র আশ্রয় । তিনি কবিতাকে " পদ্য " বলতেন ।  "স্ফুলিঙ্গ সমাদ্দার " নামে তিনি গদ্যচর্চাও করেছেন । ১৯৬১ সালে তিনি " কুয়োতলা " নামে তার প্রথম উপন্যাসটি লেখেন । প্রকৃতির পাশাপাশি প্রেম , নারী এবং মানুষকে নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন । তার জীবন ছিল বেপরোয়া এবং বন্ধহীন । যুগের যন্ত্রণাকে গায়ে মেখে তিনি অস্থিরতায় ছট্ফট করেছেন । কবির উল্লেখযোগ্য কাব্য গুলি হলো – " ধর্মে আছো জিরাফেও আছো " ঈশ্বর থাকেন জ্বলে " সোনার মাছি খুন করেছি " প্রভু নষ্ট হয়ে যায় " ইত্যাদি । তার লেখা উল্লেখযোগ্য ছোটো গল্প " নিরূপমের দুঃখ " । এছাড়াও তিনি " মেঘদূত " গালিব প্রমুখের কবিতা অনুবাদ করেছেন ।

সম্মান ও স্বীকৃতি :– " যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো " কাব্য গ্রন্থের জন্য ১৯৮৩ সালে তিনি " একাডেমী পুরস্কার " লাভ করেন ।

জীবনাবসান :– ১৯৯৫ সালে ২৩ মার্চ শান্তিনিকেতনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘটে ।


বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই, ২০১৯

বেগম রোকেয়া জীবনী মূলক রচনা

begom-rokeya-biography

ভূমিকাঃ বাঙালি মুসলিম সমাজের নারীদের অন্ধকারময় পৃথিবীতে আলোকবার্তা হাতে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া। তার সকল কর্মের মূলে ছিল নারীমুক্তির স্বপ্ন। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গিয়েই তিনি একদিকে কলম তুলে নিয়েছিলেন, অন্যদিকে নারীদের নতুন পথের সন্ধান দেখিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি আজও ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ হিসেবে পরিচিত।

জন্ম ও শৈশবজীবনঃ বেগম রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামের এক জমিদার পরিবারে। বেগম রোকেয়ার পারিবারিক নাম রোকেয়া খাতুন। তার পিতার নাম জহিরুদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবের এবং মাতার নাম রাহাতুন্নেসা। বেগম রোকেয়া যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁদের জমিদারি অনেকটা পড়ন্ত দশায় ছিল। তবুও তার শৈশব কাটে তৎকালীন মুসলমান জমিদারি রীতি অনুযায়ী কঠোর পর্দা ও অবরোধের মধ্যে। তার নিজের ভাষায় “অবিবাহিত বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং বাড়ির চাকরাণী ব্যতীত অপর কোনো স্ত্রীলোক দেখিতে পায় না।” এমন কঠোর পর্দা প্রথার মধ্যেই বেগম রোকেয়ার বেড়ে ওঠা।

শিক্ষাজীবনঃ বিশ্বের অনেক কৃতী ব্যক্তির মতো বেগম রোকেয়াও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। নিজের প্রবল আগ্রহ ও কিছু মানুষের সহায়তায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বশিক্ষিত। তাইতো সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল চালু করার সময় প্রথমদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। সামসুন্নাহার মাহমুদের ভাষায়- “রোকেয়া যখন প্রথম পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে বালিকা স্কুল স্থাপন করেন, তখন তিনি ভেবে পাননি কী করে একজন শিক্ষয়িত্রী একই সঙ্গে পাঁচটি মেয়েকে পড়াতে পারে।” তবে তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি প্রভৃতি ভাষা সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তার সাহিত্যে আমরা এর পরিচয় পাই।


জীবনে অনুপ্রেরণার উৎসঃ বেগম রোকেয়া যে মুসলিম সমাজে বেড়ে উঠেছিল সেখানে স্ত্রীশিক্ষা হিসেবে প্রচলিত ছিল ‘টিয়া পাখির মতো কোরান শরীফ’ পাঠ, নামাজ, রোজা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান। এছাড়া স্বামী বা নিকট আত্মীয়কে চিঠি লিখতে পারা, দু-একটি উর্দু-ফারসি পুঁথি পুস্তক পড়ার ক্ষমতা, সেলাই, রান্না ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তখন মেয়েদের বাংলা শিক্ষা ছিল অনেকটা নিষিদ্ধ। কিন্তু এমন সমাজের মধ্যেও বেগম রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসা একটু আধটু বাংলা পড়েছিলেন এবং ছদ্মনামে বেশ কয়েকটা কবিতাও লিখেছিলেন। করিমুন্নেসার বিদ্যানুরাগ বেগম রোকেয়াকে অনুপ্রেরণা যোগায়। এর সাথে বড় ভাই ইব্রাহিম সাবেরের প্রচেষ্টায় তিনি শৈশব থেকে কুসংস্কারকে ঘৃণা করতে শেখেন এবং বিদ্যার্জন করেন। বিয়ের পর স্বামী সাখাওয়াত হোসেনও তাকে এক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন।


বিবাহিত জীবনঃ উর্দুভাষী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয়। তাদের বিয়ের সময় বেগম রোকেয়ার বয়স ছিল ১৬ এবং সাখাওয়াত হোসেনের ছিল ৩৮ বছর। সাখাওয়াত হোসেন প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাকে বিয়ে করেন। ব্যক্তি হিসেবে সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন একজন উদারমনা, রুচিশীল, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও কুসংস্কার বিরোধী মানুষ। এছাড়া স্ত্রীশিক্ষার পক্ষপাতীও ছিলেন তিনি। তাইতো তিনি বেগম রোকেয়াকে ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। এমনকি ১৯০৯ সালে মৃত্যুর আগেই মেয়েদের শিক্ষার জন্য দশ হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। বেগম রোকেয়া ছিলেন নিঃসন্তান। তার দু’টি কন্যা সন্তান জন্ম হয়েছিল। কিন্তু তাদের অকাল মৃত্যু হয়।


বাংলা ভাষা চর্চায় প্রতিবন্ধকতাঃ উর্দুর প্রবল প্রতিকূল স্রোতে বাংলা ভাষাকে প্রাণপ্রণে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন বেগম রোকেয়া। তার স্বামী ও অভিভাবকরা সবাই ছিলেন বাংলা ভাষার বিরোধী। কিন্তু এর মাঝেও তিনি বাংলা ভাষার চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। এছাড়া স্বামী সাখাওয়াত হোসেনকে বাংলা শেখাবার ব্রতও নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার চর্চা অব্যাহত রাখতে তাকে যে নিদারুণ সংগ্রাম করতে হয়েছিল তার বর্ণনা ‘মতিচূর’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডের করিমুন্নেসার নামে উৎসর্গ পত্রে রয়েছে।


ইংরেজি ভাষার চর্চাঃ বেগম রোকেয়া বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ না করলেও ইংরেজি ভাষার ওপর তার যথেষ্ট দখল ছিল। তার লেখা ওলফভট্র, Sultana's Dream-এর প্রমাণ। এছাড়া বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের কাছে দেয়া ইংরেজিতে লেখা চিঠিও এর প্রমাণ বহন করে।


সাহিত্য কর্মঃ আধুনিক জাগরণশীল বাঙালি মুসলিম সমাজে বেগম রোকেয়াই প্রথম উল্লেখযোগ্য লেখিকা। সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি মিসেস আর এস হোসেন নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা পিপাসা। ১৯০১ সালে ‘নবপ্রভা’ পত্রিকায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এছাড়া তাঁর বিভিন্ন লেখা নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হত। তার গ্রন্থের সংখ্যা পাঁচটি। এগুলো হলো- মতিচূর (প্রথম খন্ড), সুলতানার স্বপ্ন, মতিচূর (দ্বিতীয় খন্ড), পদ্মরাগ ও অবরোধবাসিনী। এছাড়া সম্প্রতিকালে বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে আরও কিছু রচনা ও চিঠিপত্র পাওয়া গেছে।


সাহিত্য ও নারী মুক্তিঃ
“সুকঠিন গার্হস্থ্য ব্যাপারসুশৃঙ্খলে কে পারে চালাতেরাজ্যশাসনের রীতিনীতিসূক্ষ্মভাবে রয়েছে ইহাতে।”বেগম রোকেয়া এই কথাটি শুধু মুখেই বলেননি তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাইতো নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে নারীর মানবীয় সত্তার প্রতিষ্ঠা কামনা করেছেন। মুসলিম নারী সমাজের কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করতে এবং জড়তা দূর করতে তিনি সাহিত্যকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি বলতেন- “না জাগিলে ভারত ললনা, এ ভারত আর জাগিবে না।” তাই তিনি তার লেখার মাধ্যমে নারীর জাগরণের জন্য লড়াই করেছেন। মুক্তিফল গল্পে তাই বলেছেন- “কন্যারা জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত দেশমাতৃকার মুক্তি অসম্ভব।” বেগম রোকেয়ার মতে এই জাগরণের প্রধান শর্ত শিক্ষা। তার ভাষায় “আমরা পুরুষের ন্যায় সাম্যক সুবিধা না পাইয়া পশ্চাতে পড়িয়া আছি।” তিনি বুঝেছিলেন শিক্ষাই হলো স্বনির্ভরতার সোপান। তাই শিক্ষাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য, আর্থিক সমস্যা, সামাজিক বাধা, লোকনিন্দা কোনো কিছুই তাকে এই ব্রত থেকে সরাতে পারেনি। তাইতো স্ত্রী জাতির অবনতি, অর্ধাঙ্গী, সুগৃহিনী, বোরকা, গৃহ, জাগো গো ভগিনী প্রভৃতি প্রবন্ধে তিনি এই শিক্ষার জয়গানই গেয়েছেন, দিয়েছেন নারী মুক্তির দীক্ষা।


সমাজ সংগঠকঃ বেগম রোকেয়া কেবল লেখিকাই নন, নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন। তিনি ১৯০৯ সালে ১ অক্টোবর ভাগলপুরে পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই তিনি একটি আন্দোলনের সৃষ্টি করেন। এই ধারাই শিক্ষার ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে তিনি ১৯১৬ সালে “আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম” নামে একটি মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই বিদ্যালয় ও নারী সমিতির কাজে তিনি নিয়োজিত ছিলেন।


অন্তিম যাত্রাঃ বেগম রোকেয়া ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ৫২ বছর বয়সে আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগের রাতেও এগারোটা পর্যন্ত তিনি “নারীর অধিকার” নামক একটি প্রবন্ধ লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কলকাতার কাছাকাছি চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত সোদপুরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার স্মরণে প্রথমে কলকাতার আলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউজ) ও পরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে দুটি শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই শোকসভায় হিন্দু মুসলমান একই সাথে যোগদান করেছিলেন। সেখানে এক ভাষণে সৈয়দ এমদাদ আলী বলেছিলেন- “তাহার স্মৃতির উপরে আজ বাংলার মুসলমান সমাজ যে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতেছেন, বাংলার কোনো মুসলমান পুরুষের মৃত্যুতে সেরূপ করিয়াছেন বলিয়া জানি না।”


উপসংহারঃ বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীমুক্তির অগ্রদূত হিসেবে বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব সত্যিই বিস্ময়কর। কারণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সংগ্রাম করেছিলেন নারীমুক্তির লক্ষ্যে, নারীশিক্ষার লক্ষ্যে। বর্তমান নারী সমাজ যে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে তার অনেকটাই বেগম রোকেয়ার অবদান। এ জন্যই ২০০৪ সালের বিবিসি জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় তিনি ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন। তাই আবুল হুসেনের ভাষায় বলা যায়- “তাহার মতো চিন্তাশীল নারী প্রকৃতই নারীজাতি কেনো, সমগ্র মানবজাতির গৌরবের পাত্রী।”



/>

মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৯

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ জীবনী মূলক রচনা

syed-mustafa-siraj-biography

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ জীবনী মূলক রচনা


জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :– সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ১৯৩০ খিস্টাবদের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদ জেলার খোশবাস পুর গ্রামে এক অভিজাত মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেখানে শিক্ষা এবং সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার একটা সুন্দর পরিবেশ ছিল । শুধু তাই নয় , আরবি , ফারসি , সংস্কৃত প্রভুতি ভাষার চর্চাও হত তার পরিবারে । লেখকের মা আনোয়ার বেগম ছিলেন একজন খ্যাতনামা কবি । সে কারনেই শৈশব থেকেই সিরাজ হৃদয় দিয়ে সাহিত্য রস আস্বাদন করতে শিখে ছিলেন । 

ছাত্রজীবন :– সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ১৯৪৬ খিস্টাবদে বর্ধমান জেলার " গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় " থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন । বহরম পুর কৃষ্ণ নাথ কলেজ থেকে এরপর তিনি স্নাতক হন । স্কুলজীবন থেকেই বাইরের বই পড়ার আগ্রহ তৈরী হয় তার । 

কর্মজীবন :– যৌবনের শুরুতেই সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন । সেই সূত্রেই তিনি লোকনাট্য দল " আলকাপ " _ এর সঙ্গে যুক্ত হন  ১৯৫০ খিস্টাবদে । সেই দলে তিনি বাঁশি বাজাতেন  এবং লোকনাট্য ও লোক নৃতের প্রশিক্ষণ দিতেন । এই দলের সূত্রে তিনি গ্রামবাংলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান এবং সেইসব স্থানের সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে পরিচিত হন । বঙ্গদেশের বিভিন্ন জেলা যেমন মুর্শিদাবাদ , মালদা , বর্ধমান , বীরভূম এমনকি কলকাতাতেও তিনি এই কাজের সুত্রে ঘুরে বেড়াতেন । ১৯৫৬ খিস্টাবদ পযন্ত সিরাজ আলাপ _ এর দলের হয়ে সারারাত্রিব্যাপী  অনুষ্ঠান করতেন । তার পরবর্তী জীবনের লেখালেখিতে এই অভিজ্ঞা প্রভাব ফেলেছে ।

[ ] পরবর্তীকালে সিরাজের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে । তিনি অনুভব করেন যে , তার চারদিকে আরও বড় পৃথিবী পড়ে রয়েছে । অবশ্য তিনি আগেই কবিতা এবং ছোটো গল্প লেখা শুরু করেন । ১৯৫০ খিস্টাবদে "ইবলিশ" ছদ্মনামে লেখা তার প্রথম গল্প " কাঁচি " প্রকাশিত হয় বহরমপুরের " সুপ্রভাত " পত্রিকায় । ওই একই বছরে " দেশ " পত্রিকায় " শেষ অভিসার " নামক কবিতা প্রকাশিত হয় তার । ১৯৬২ তে সাপ্তাহিক " দেশ " পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার লেখা গল্প " ভালোবাসা ও ডাউন ট্রেন " । ১৯৬৪ খিস্টাবদে তিনি " ভান্ডার " পত্রিকায় যোগ দেন । এর পাশাপাশি গল্প লেখা চলতে থাকে তার । এরপর ১৯৬৬ খিস্টাবদে তার প্রথম উপন্যাস " নীল ঘরের নটি " প্রকাশিত হলে তিনি ক্রমে ক্রমে উপন্যাসিক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন । ১৯৭১ – এ তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন ।
সাহিত্যকর্ম :– সারাজীবন ধরে তিনি ১৫০ টির মতো উপন্যাস এবং ৩০০ টির মতো ছোটগল্প লিখেছেন । এগুলির মধ্যে " ইন্তিপিসি ও ঘাটবাবু " , ভালোবাসা ও ডাউন ট্রেন , মানুষের জন্ম , রণভূমি , রক্তের প্রত্যাশা , মাটি – প্রভুতি ছোটো গল্প এবং অলীক মানুষ , কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি , প্রভুতি উপন্যাস উল্লেখযোগ্য । 

[] সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ডিটেকটিভ চরিত্র " গোয়েন্দা কর্নেল "  । এই চরিত্রটি নিয়ে তিনি শিশু ও কিশোর – কিশোরীদের জন্য যেসব গোয়েন্দা – কাহিনী রচনা করেছেন , তা তাকে খ্যাতির তুঙ্গে নিয়ে যায় ।



সম্মান ও স্বীকৃতি :– সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বহু পুরষ্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন । ১৯৭৯ খিস্টাবদে তিনি পান " আনন্দ পুরস্কার " । তার সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস " অলীক মানুষ " _এর জন্য তিনি " বঙ্কিম পুরষ্কার " " এবং " সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার " লাভ করেন । তিনি নরহরি দাস পুরষ্কার পান । ২০১০ _ এ তিনি পান বিদ্যাসাগর পুরষ্কার ।


জীবনাবসান :– ২০১২ সালে ৪ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে এই পন্ডিত সাহিত্যিকের মৃত্যু হয় । সত্বন্ত্র ধারার কথাসাহিত্যিক হিসেবে এবং গোয়েন্দা কর্নেল চরিত্রের শ্রেষ্ঠা হিসেবে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ।

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৯

মহাশ্বেতা দেবী জীবনীমূলক রচনা

mohasweta-debi-biography

         মহাশ্বেতা দেবী জীবনীমূলক রচনা


জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :– প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৯২৬ খিস্টাবদে ১৪ জনুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা শহরে । তার বাবা ছিলেন যুব নাশম্ম ছদ্মনাম গ্রহণকারী বিশিষ্ট কবি এবং সনামাধন্য গদ্যকার মণীশ ঘটক , মা ধরিত্রী দেবী । বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক ছিলেন তার কাকা । " নবান্ন "  খ্যাত প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচাযের সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবীর বিবাহ হয় । সাহিত্যিক সাংবাদিক নবারুণ ভট্টাচায তাদের একমাত্র সন্তান । 

শিক্ষাজীবন :– মহাশ্বেতা দেবীর শিক্ষা শুরু হয় রাজশাহীতে । পরবর্তী কালে কলকাতার আশুতোষ কলেজ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াশোনা করেন । কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য

স্নাকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন । 

কর্মজীবন :– অবসরের আগে নানা প্রকার পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি । স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন , কলেজে অধ্যাপনা করেছেন , পত্র পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেছেন । সাংবাদিক জীবনে তিনি " যুগান্তর " পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । ১৯৮০ খিস্টাবদে থেকে সাহিত্যরচনাই তার একমাত্র পেশা হয়ে দাড়ায় । 

সমাজসেবা ও রাজনীতি :–  মহাশ্বেতা দেবী  সমাজসেবী এবং রাজনীতিবিদ হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন । বাবা ও কাকার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যৌবন থেকেই বামপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন । বৈপ্লবিক চিন্তা ধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তার রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে – গঞ্জে । শবর , খেরিয়া ইত্যাদি অরন্যচারি উপজাতির উন্নয়নে তিনি নিজেকে সপে দেন । ভারতের বিভিন্ন উপজাতি অঞ্চলেও তার কর্মধারা প্রসারিত হয়েছে । সমাজসেবা এবং রাজনীতির এই বিপুল অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় তার সাহিত্যকর্মে । 

সাহিত্যকর্ম :– মহাশ্বেতা দেবীর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ইতিহাসনির্ভর জীবনী " ঝাঁসির রানী " । তার প্রথম উপন্যাস " নটি " । তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো " মধুর প্রেম " ,"রুদালি " , " প্রেমতারা ", " হাজার চুরাশির মা ", অরন্যের অধিকার ", গণেশ মহিমা , বিশ একুশ , ইত্যাদি । সমাজের তথাকথিত নিম্নবিত্ত  ও নিম্নবর্গের মানুষের জীবন যাপন এবং তাদের আশা , হতাশা , স্বপ্ন , সংগ্রামের সংবেদনশীল এবং প্রতিবাদী রূপ উঠে এসেছে তার সাহিত্য – সৃষ্টিতে । অধিবাসী এবং সমাজের অন্যান্য সর্বহারা মানুষের জীবনের উন্নয়নে যেমন তিনি ব্রতী হয়েছেন , তেমনি তাদের জীবনকথা নিয়েই তিনি শিল্পসার্থক ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছেন । মহাশ্বেতা দেবী " বর্তিকা " নামক একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন । 

সম্মান ও স্বীকৃতি :– মহাশ্বেতা দেবী তার নিরলস সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য সাধনার জন্য বহু পুরস্কারের ভূষিত হয়েছেন । তিনি ১৯৮৬ খিস্টাবদে একাডেমী পুরস্কারে এবং ১৯৯৬ খিস্টাবদে ম্যাগসেসে পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । এছাড়াও তিনি " পদ্মশ্রী " , " দেশিকোওম " , প্রভুতি উপাধিও লাভ করেছেন । তবে নিছক পুরস্কার প্রাপ্তির মানদন্ডেই তার কর্মময় জীবন এবং সৃজশীল অবদানের মূল্যায়ণ করা যায় না ।

জীবনবাসান :– ২৮ জুলাই ২০১৬  ( ৯০ ) বয়সে মৃত্যু হয় । পশ্চিমবঙ্গ ।

রবিবার, ৯ জুন, ২০১৯

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা জীবনী মূলক রচনা

manik-bondopaddhay-biography

                     মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় 

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :– বাংলা কথসাহিত্যের ইতিহাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক উজ্জ্বল নাম । বাস্তব জীবনের চিত্র রূপায়নে এবং সতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের রূপদানে তিনি ছিলেন অনণ্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ঝাড়খণ্ড রাজ্যর ( তৎকালীন বিহার ) দুমকায়, ১৯০৮ খিষ্টাব্দ ১৯ মে । তার বাবার নাম হরিহর বন্দোপাধ্যায় , মায়ের নাম নিরদা দেবী । মানিকের পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রম পুরের কাছে মালবদিয়ায় । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসল নাম ছিল প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় । গায়ের রং কালো ছিল বলে তার ডাকনাম হয়েছিল কালো তথা মানিক । এই ' মানিক ' নামেই তিনি পরবর্তীকালে  পরিচিতি পান । তার পিতার ছিল বদলির চাকরি । সরকারের সেটেলমেন্ট বিভাগে কানুনগো পদে চাকরি করতেন তিনি । মানিকের শৈশব তাই কেটেছে বাংলা ও বিহারের  ( অবিভক্ত ) বিভিন্ন স্থানে । শৈশবে মানিক যেমন দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন , তেমনি ছিলেন খুব হাসিখুশি । 

ছাত্রজীবন :– কলকাতা থেকে মানিকের বাবা টাঙ্গাইলে বদলি হয়ে যাবার পর মিত্র স্কুলের ছাত্র শিশু মানিক টাঙ্গাইল জেলা স্কুলে ভর্তি হন । এই সময় তিনি খুব দুরন্ত হয়ে ওঠেন এবং মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেতেন । প্রতিবারই তাকে খুঁজে পাওয়া যেত মাঝিদের নৌকায় কিংবা আস্তাবলে । ১৯২২ খিস্টাবদে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন । এরপর বাবার বদলিসূত্রে তাকে মহিষাদল , কাথি , মেদিনীপুর , প্রভুতি স্থানে থাকতে হয় । মেদিনীপুরে থাকাকালীন মানিক ১৯২৬ খিস্টাবদে মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন এবং প্রথম বিভাগে পাশ করেন । বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজ থেকে ১৯২৮ খিস্টাবদে তিনি আই এস সি পাশ করেন । ওই বছরই তিনি কলকাতার প্রেসডেন্সি কলেজে গণিতে সাম্মানিক ( অনাস ) নিয়ে  বিএসসি – তে ভরতি হন । গান গাওয়া , কুস্তি লরা, বাঁশি বাজানো , এসবের প্রতি কলেজ – জীবনে খুব অনুরক্ত হয়ে পড়েন মানিক । কিন্তু স্নাতক স্তরের শিক্ষা আর শেষ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি এই প্রতিভাবান যুবকের । প্রেসিডেন্সিতে ভরতি হবার কিছু দিনের মধ্যেই সাহিত্য সাধনার নেশা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসে যে , প্রথাগত পড়াশোনায় দাড়ি টানতে হয় তাকে । 

কর্মজীবন :–সাহিত্যের জগতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটেছিল আকস্মিকভাবে । প্রেসিডেন্সি তে পড়বার সময় সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে একদিন গল্পে মেতেছিলেন তিনি । কথা প্রসঙ্গে এক বন্ধু বলেছিলেন যে , নামকরা লেখক না হলে বিখ্যাত পত্রিকা গুলো লেখা ছাপায় না । এ প্রসঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের  দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ভালো লেখা হলে অনামী লেখকের রচনাও নিশ্চয় ছাপা হবে । বন্ধুদের সঙ্গে এই নিয়ে তর্ক বাঁধলে তিনি তাদের বলেন যে , তিন মাসের মধ্যেই তিনি তাঁর বিশ্বাসের সত্যতার প্রমাণ দেবেন । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাই " অতসী মামী " নামক একটি গল্প লিখে তখনকার নামি পত্রিকা " বিচিত্রা " –র অফিসে জমা দিয়ে আসেন । লেখক হিসেবে তিনি ' প্রবোধকুমার ' নাম না দিয়ে ' মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়  ' নামটিই সেখানে ব্যাবহার করেন । যথাসময়ে সেই গল্পটি মুদ্রিত হয় এবং লেখক ও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে । এভাবেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়ের লেখক জীবনের সূচনা হয় । " অতসী মামী "  গল্পটি প্রকাশের পর বিভিন্ন পত্র পত্রিকা থেকে মানিকের কাছে লেখার জন্য আহ্বান আসতে থাকে । তিনিও মন প্রাণ দিয়ে লিখতে থাকেন । অভিভাবকরা তাকে লেখা পড়ায় মন দিতে বললেও তিনি তাঁদের কথায় কান দেননি । অবশেষে লেখা পড়ার ইতি টেনে তিনি সাহিত্যকর্মকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন । ১৯৩৭ খিস্টাবদে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় " বঙ্গশ্রী " পত্রিকার সহ সম্পাদক নিযুক্ত হলেও পত্রিকার মালিকের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সেই চাকরিতে ইস্তফা দেন । এরপর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে " উদয়াচল  প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউস " নামক একটি প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন । তবুও সারাজীবন এই প্রতিভাবান সাহিত্যিককে দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছে । 

সাহিত্যকর্ম :–  কলেজে পাঠরত অবস্থায় আকস্মিকভাবেই সাহিত্য জগতে অভিষেক ঘটে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের । তার রচনারিতি নিয়ে সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে । কেউ কেউ বলেন , ফ্রয়েডীয় মনস্ততত্বের দ্বারা তিনি প্রথম জীবনে প্রভাবিত হলেও তার শেষ ১২ বছরের লেখক জীবনিকে প্রভাবিত  করেছিলেন প্রখ্যাত প্রখ্যাত দার্শনিক কাল মার্কস । অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথা যথই বলেছেন অতীত আচ্ছন্ন জীবনচর্চায় যত খানি শিল্প সম্মত ভাবে রূপায়িত হতে পারে , মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস তার চরম সীমায় পৌঁছেছে । 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাস এবং ছোট গল্প – দুই – ই রচনা করেছেন । এই কথা সাহিত্যিক ৫৭ টি গ্রন্থের প্রণেতা । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস গুলি হলো " জননী " ( ১৯৩৫ ) , " পুতুল নাচের ইতিকথা  (১৯৩৬) " " পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৩৬) " , " দর্পণ (১৯৪৫)," " শহর বাসের ইতিকথা  " (১৯৪৬) , ইত্যাদি । 

জীবনাবসান :– মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হননি । তার সাহিত্য জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করে । নানা প্রকার অসুখে আক্রান্ত হয়ে ১৯৫৬ খিস্টাবদের ৩ ডিসেম্বর মাত্র আটচল্লিশ ( ৪৮ ) বছর বয়সে এই অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষটির জীবনাবসান ঘটে ।




বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯

শম্ভু মিত্র জীবনী বা জীবনী মূলক রচনা

shombhu-mitra-biography-ba-rochona

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :– বাংলা তথা ভারতীয় নাট্য জগতের কিংবদন্তি ব্যাক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের জন্ম হয় ১৯১৫ সালে ২২ আগস্ট । তার পিতার নাম শরৎ কুমার মিত্র এবং মাতা শতদল বাসিনী দেবী । শম্ভু মিত্রের পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলায় । কিন্তু কলকাতায় ভবানীপুরে মাতামহ আদিনাথ বসুর বাড়িতেই তার জন্ম হয় । ১৯৪৫ সালে তিনি প্রখ্যাত মঞ্চাভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্রর সঙ্গে পরিনয়সূত্রে আবদ্ধ হন ।


ছাত্রজীবন :– শম্ভু মিত্রের প্রথম জীবনের পড়াশোনা শুরু হয় চক্রবেরিয়া মিডল ইংলিশ স্কুলে । এরপরে তিনি বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট স্কুলে ভরতি হন । বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে এরপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভরতি হলেও তিনি পড়াশোনা সমাপ্ত করেননি ।


নাট্যজীবন :– ১৯৩৯ সালে " রঙমহল " থিয়েটার - এ যোগদানের মাধ্যমে শম্ভু মিত্রের বানিজ্যিক নাট্য মঞ্চে পর্দাপন । এখানেই মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তার । রঙমহল বন্ধ হয়ে গেলে প্রথমে তিনি যোগদেন " মিনাভায় " । সেখানে অল্পদিন থেকে তারপর যোগদেন " নাট্য নিকেতন " এ । নাট্য নিকতনে " কালিন্দী " নাটকে অভিনয়ের সূত্রে সে যুগের প্রতি তজশা নাট্য ব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীর সঙ্গে তার আলাপ হয় । পরবর্তীকালে শিশির কুমার ভাদুড়ী প্রযোজিত " আলমগীর " নাটকে অভিনয় করলেও সম্পূর্ণ নতুন এক নাট্যঘরানা তৈরীতে উদ্যোগী হন তিনি । এরপর নাট্যনিকেতন ও বন্ধ হয়ে গেলে তিনি " শ্রী রঙ্গম " এ যোগ দেন । কিন্তু পেশাদার মঞ্চের সঙ্গে শম্ভু মিত্র একাত্ম হতে পারছিলেন না । এই পর্বেই ১৯৪২ সালের শেষ দিকে বিনয় ঘোষ এবং বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে ফ্রাসি বিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ হয়ে তিনি যোগদেন " ভারতীয় গননাট্য সংঘ " এ । ১৯৪৪ এ " নবান্ন " নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বাংলা নাটকের যে নবযুগের সূচনা হয় তাতে অভিনেতা ও সহ পরিচালক হিসেবে শম্ভু মিত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । শুধু রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের পরিবর্তে স্বাধীন এবং মুক্তচিন্তা সমৃদ্ধ নাটকে অভিনয়ের লক্ষ্য শম্ভু মিত্র গণনাট্য ত্যাগ করেন ।




[ ] ১৯৪৮ সালে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে শম্ভু মিত্র গড়ে তোলেন তার নিজের নাট্য দল " বহুরূপী " । ১৯৫০ - এ অভিনীত হয় " ছেড়া তার " এবং উলুখাগরা । ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত " বহুরূপী " প্রযোজনায় সফোক্লিস , হেনরিক ইবসেন , তুলসী লাহিড়ী প্রমুখ বিশিষ্ট নাট্যকারের রচনা তার পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয় । শম্ভু মিত্র বাংলা রঙ্গ মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ কে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন – " রক্তকরবী " , চার অধ্যায় , বিসর্জন , রাজা ইত্যাদি একের পর এক রবীন্দ্রনাটকের অসামান্য উপস্থাপনা বাংলা নাটকের ইতিহাসে মাইলফলক । অভিনেতা ও পরিচালক শম্ভু মিত্রের মতোই নাট্যকার শম্ভু মিত্রও  বাংলা নাটকে স্মরনীয় । চাঁদ বনিকের পালা ইত্যাদি অসামান্য  নাটকের রচনাকারও তিনি । এছাড়া তিনি নাটক বিষয়ক বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন । অভিনয় , নাট্য মঞ্চ , প্রসঙ্গ নাট্য , ইত্যাদি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য । ১৯৭০ সালে একটি আর্ট কম্পেলেক্স নির্মাণের উদ্দেশ্যে তিনি " বঙ্গীয় নাট্যমঞ্চ সমিতি " গঠন করেন । যদিও পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি ।

[ ] কন্যা শাওলী মিত্রের নাট্যসংস্থা " পঞ্চম বৈদিক " এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি । জীবনের শেষ পর্যায়েও এই সংস্থার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন ।
আবৃত্তি :–  একজন স্বনামধন্য আবৃত্তিকার হিসেবে শম্ভু মিত্রের পরিচিতি ছিল সর্বব্যাপী । তার কণ্ঠে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের " মধুবংশীর  গলি " আজও অমর । " রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ " , দিনান্তের প্রণাম , এই দুটি তার অতিপ্রসিদ্ধ বাংলা কবিতা আবৃত্তির রেকর্ড ।
চলচ্চিত্র :– কেবলমাত্র নাটক নয় , চলচ্চিত্রেও তিনি অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন । মানিক , শুভ বিবাহ , পথিক , অভিযাত্রী , ধাত্রী দেবতা , আবত , মরনের পারে , ইত্যাদি তার অভিনীত কিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্র । খাজা আহমেদ আব্বাসের পরিচালনায় " ধরতি কে লাল " হিন্দি ছবিটির সহকারী পরিচালক ছিলেন তিনি ।


সম্মান ও স্বীকৃতি :– নাট্য জগতে তার অসামান্য অবদানের জন্য শম্ভু মিত্র স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেক । ১৯৭৬ সালে তিনি পান " ম্যাগসেস পুরষ্কার " । ওই বছরই ভারত সরকার তাকে " পদ্মভূষণ " উপাধিতে ভূষিত করে । ১৯৮৩ সালে বিশ্বভারতী তাকে " দেশিকোওম " উপাধি দেয় । যাদব পুর বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডি. লিট . উপাধিতে ভূষিত করে ।
জীবনবসান :– ১৯৯৭ সালে ১৯ মে কলকাতায় নিজের বাসভবনে শম্ভু মিত্র প্রয়াত হন ।