রবিবার, ৯ জুন, ২০১৯

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা জীবনী মূলক রচনা

manik-bondopaddhay-biography

                     মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় 

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :– বাংলা কথসাহিত্যের ইতিহাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক উজ্জ্বল নাম । বাস্তব জীবনের চিত্র রূপায়নে এবং সতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের রূপদানে তিনি ছিলেন অনণ্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ঝাড়খণ্ড রাজ্যর ( তৎকালীন বিহার ) দুমকায়, ১৯০৮ খিষ্টাব্দ ১৯ মে । তার বাবার নাম হরিহর বন্দোপাধ্যায় , মায়ের নাম নিরদা দেবী । মানিকের পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রম পুরের কাছে মালবদিয়ায় । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসল নাম ছিল প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় । গায়ের রং কালো ছিল বলে তার ডাকনাম হয়েছিল কালো তথা মানিক । এই ' মানিক ' নামেই তিনি পরবর্তীকালে  পরিচিতি পান । তার পিতার ছিল বদলির চাকরি । সরকারের সেটেলমেন্ট বিভাগে কানুনগো পদে চাকরি করতেন তিনি । মানিকের শৈশব তাই কেটেছে বাংলা ও বিহারের  ( অবিভক্ত ) বিভিন্ন স্থানে । শৈশবে মানিক যেমন দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন , তেমনি ছিলেন খুব হাসিখুশি । 

ছাত্রজীবন :– কলকাতা থেকে মানিকের বাবা টাঙ্গাইলে বদলি হয়ে যাবার পর মিত্র স্কুলের ছাত্র শিশু মানিক টাঙ্গাইল জেলা স্কুলে ভর্তি হন । এই সময় তিনি খুব দুরন্ত হয়ে ওঠেন এবং মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেতেন । প্রতিবারই তাকে খুঁজে পাওয়া যেত মাঝিদের নৌকায় কিংবা আস্তাবলে । ১৯২২ খিস্টাবদে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন । এরপর বাবার বদলিসূত্রে তাকে মহিষাদল , কাথি , মেদিনীপুর , প্রভুতি স্থানে থাকতে হয় । মেদিনীপুরে থাকাকালীন মানিক ১৯২৬ খিস্টাবদে মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন এবং প্রথম বিভাগে পাশ করেন । বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজ থেকে ১৯২৮ খিস্টাবদে তিনি আই এস সি পাশ করেন । ওই বছরই তিনি কলকাতার প্রেসডেন্সি কলেজে গণিতে সাম্মানিক ( অনাস ) নিয়ে  বিএসসি – তে ভরতি হন । গান গাওয়া , কুস্তি লরা, বাঁশি বাজানো , এসবের প্রতি কলেজ – জীবনে খুব অনুরক্ত হয়ে পড়েন মানিক । কিন্তু স্নাতক স্তরের শিক্ষা আর শেষ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি এই প্রতিভাবান যুবকের । প্রেসিডেন্সিতে ভরতি হবার কিছু দিনের মধ্যেই সাহিত্য সাধনার নেশা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসে যে , প্রথাগত পড়াশোনায় দাড়ি টানতে হয় তাকে । 

কর্মজীবন :–সাহিত্যের জগতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটেছিল আকস্মিকভাবে । প্রেসিডেন্সি তে পড়বার সময় সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে একদিন গল্পে মেতেছিলেন তিনি । কথা প্রসঙ্গে এক বন্ধু বলেছিলেন যে , নামকরা লেখক না হলে বিখ্যাত পত্রিকা গুলো লেখা ছাপায় না । এ প্রসঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের  দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ভালো লেখা হলে অনামী লেখকের রচনাও নিশ্চয় ছাপা হবে । বন্ধুদের সঙ্গে এই নিয়ে তর্ক বাঁধলে তিনি তাদের বলেন যে , তিন মাসের মধ্যেই তিনি তাঁর বিশ্বাসের সত্যতার প্রমাণ দেবেন । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাই " অতসী মামী " নামক একটি গল্প লিখে তখনকার নামি পত্রিকা " বিচিত্রা " –র অফিসে জমা দিয়ে আসেন । লেখক হিসেবে তিনি ' প্রবোধকুমার ' নাম না দিয়ে ' মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়  ' নামটিই সেখানে ব্যাবহার করেন । যথাসময়ে সেই গল্পটি মুদ্রিত হয় এবং লেখক ও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে । এভাবেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়ের লেখক জীবনের সূচনা হয় । " অতসী মামী "  গল্পটি প্রকাশের পর বিভিন্ন পত্র পত্রিকা থেকে মানিকের কাছে লেখার জন্য আহ্বান আসতে থাকে । তিনিও মন প্রাণ দিয়ে লিখতে থাকেন । অভিভাবকরা তাকে লেখা পড়ায় মন দিতে বললেও তিনি তাঁদের কথায় কান দেননি । অবশেষে লেখা পড়ার ইতি টেনে তিনি সাহিত্যকর্মকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন । ১৯৩৭ খিস্টাবদে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় " বঙ্গশ্রী " পত্রিকার সহ সম্পাদক নিযুক্ত হলেও পত্রিকার মালিকের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সেই চাকরিতে ইস্তফা দেন । এরপর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে " উদয়াচল  প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউস " নামক একটি প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন । তবুও সারাজীবন এই প্রতিভাবান সাহিত্যিককে দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছে । 

সাহিত্যকর্ম :–  কলেজে পাঠরত অবস্থায় আকস্মিকভাবেই সাহিত্য জগতে অভিষেক ঘটে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের । তার রচনারিতি নিয়ে সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে । কেউ কেউ বলেন , ফ্রয়েডীয় মনস্ততত্বের দ্বারা তিনি প্রথম জীবনে প্রভাবিত হলেও তার শেষ ১২ বছরের লেখক জীবনিকে প্রভাবিত  করেছিলেন প্রখ্যাত প্রখ্যাত দার্শনিক কাল মার্কস । অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথা যথই বলেছেন অতীত আচ্ছন্ন জীবনচর্চায় যত খানি শিল্প সম্মত ভাবে রূপায়িত হতে পারে , মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস তার চরম সীমায় পৌঁছেছে । 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাস এবং ছোট গল্প – দুই – ই রচনা করেছেন । এই কথা সাহিত্যিক ৫৭ টি গ্রন্থের প্রণেতা । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস গুলি হলো " জননী " ( ১৯৩৫ ) , " পুতুল নাচের ইতিকথা  (১৯৩৬) " " পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৩৬) " , " দর্পণ (১৯৪৫)," " শহর বাসের ইতিকথা  " (১৯৪৬) , ইত্যাদি । 

জীবনাবসান :– মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হননি । তার সাহিত্য জীবন কেটেছে চরম দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করে । নানা প্রকার অসুখে আক্রান্ত হয়ে ১৯৫৬ খিস্টাবদের ৩ ডিসেম্বর মাত্র আটচল্লিশ ( ৪৮ ) বছর বয়সে এই অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষটির জীবনাবসান ঘটে ।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

/>