জীবনী মূলক রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জীবনী মূলক রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৬ এপ্রিল, ২০২১

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী জীবনীমূলক রচনা । Upendra Kishore Ray Chowdhury

 

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী জীবনীমূলক রচনা । Upendra Kishore Ray Chowdhury

 

 

জন্ম ও পরিবার :
উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৭ বৈশাখ (১৮৬৩ সালের ১২  | ময়মনসিংহ জেলার বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে, যা অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। তার পিতা কালিনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফারসি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত। তার ডাকনাম ছিল শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। তার পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তার পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্য জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের পিতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। যদিও নবাব সিরাজ উদ দৌলার বংশধরদের সঙ্গে বাংলার বিখ্যাত রায় পরিবারের কোনও যোগাযোগ নেই।



শিক্ষা জীবন : মেধাবী ছাত্র বলে পড়াশোনায় ভাল ফল করলেও ছোটোবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের পড়াশোনার থেকে বেশি অনুরাগ ছিল বাঁশী, বেহালা ও সঙ্গীতের প্রতি। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে।


সাহিত্যজীবন : একুশ বছর বয়সে বিএ পাস করে ছবি আঁকা শিখতে আরম্ভ করেন উপেন্দ্রকিশোর। এই সময় তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য হওয়ায় তার অনেক আত্মীয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য ঘটে। ছাত্র থাকাকালীনই তিনি ছোটোদের জন্যে লিখতে আরম্ভ করেন। সেই সময়কার সখা, সাথী, মুকুল ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত বালক নামে মাসিক পত্রিকাগুলিতে তার লেখা প্রকাশ হতে শুরু হয়। প্রথমদিকের (যেমন সখা, ১৮৮৩) প্রকাশিত লেখাগুলি ছিল জীববিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ। তার পরে চিত্র অলঙ্করণযুক্ত গল্প প্রকাশিত হতে আরম্ভ হয়। ১৮৮৬ সালে ২৩ বছরের উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম পক্ষের কন্যা বিধুমুখীর বিবাহ হয়, এবং তখনকার কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরের বিপরীতে লাহাদের বাড়ির দোতলায় কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরেরর সংসার জীবন শুরু হয়। উপেন্দ্রকিশোরের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলেরা হলেন সুকুমার, সুবিনয় ও সুবিমল, এবং মেয়েরা হলেন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা। প্রত্যেকেই শিশু সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। জ্যেষ্ঠা কন্যা সুখলতা রায় ও জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমার রায় উল্লেখযোগ্য।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সিটি বুক সোসাইটি থেকে তার প্রথম বই "ছেলেদের রামায়ণ" প্রকাশিত হয়। এই বইটি সমাজে অতি আদরের সঙ্গে সমাদৃত হলেও মুদ্রণ সম্বন্ধে অতৃপ্ত উপেন্দ্রকিশোর ১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে তখনকার দিনের আধুনিকতম মুদ্রণযন্ত্রাংশাদি নিজের খরচায় আমদানি করেন, এবং ৭ নম্বর শিবনারায়ণ দাস লেনে নতুন ভাড়াবাড়ি নিয়ে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স নামে নতুন ছাপাখানা খোলেন। এখানের একটি কামরায় তিনি নিজের আঁকার স্টুডিও খোলেন এবং সেখানে হাফটোন ব্লক প্রিন্টিং নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষা করেন। ১৯১১ সালে তিনি বড় ছেলে সুকুমারকে বিলাতে পাঠান ফোটোগ্রাফী ও মুদ্রণ সম্বন্ধে উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্যে।




মৃত্যু : ১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি পরলোক গমন করেন।




/>

সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০২১

আশাপূর্ণা দেবী জীবনীমূলক রচনা | Ashapurna Devi

 

আশাপূর্ণা দেবী জীবনীমূলক রচনা | Ashapurna Devi

 

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :

আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম হয় ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জানুয়ারি (বাংলা ২৪ পৌষ, ১৩১৫) শুক্রবার সকালে উত্তর কলকাতায় মাতুলালয়ে। পিতার নাম হরেন্দ্র নাথ গুপ্ত এবং মাতা সরলাসুন্দরী দেবী । হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন কমর্শিয়াল আর্টিস্ট ; সেযুগের জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকাগুলিতে ছবিও আঁকতেন। তার রাজভক্তি ও রক্ষণশীলতার বিপরীতে অবস্থান করতেন মা সরলাসুন্দরী দেবী। সাহিত্যপাঠই ছিল তার জীবনের একমাত্র ‘পরমার্থ’। রাজনৈতিক আদর্শে ছিলেন কট্টর ব্রিটিশ-বিদ্বেষী স্বদেশী।

গুপ্ত-পরিবারের আদিনিবাস ছিল হুগলি জেলার বেগমপুরে। যদিও আশাপূর্ণা দেবীর জীবনের সঙ্গে এই অঞ্চলটির কোনও প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না। তার ছোটোবেলা কেটেছে উত্তর কলকাতাতেই, ঠাকুরমা নিস্তারিনী দেবীর পাঁচ পুত্রের একান্নবর্তী সংসারে। পরে হরেন্দ্রনাথ যখন তার আপার সার্কুলার রোডের (বর্তমান আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোড) নিজস্ব বাসভবনে উঠে আসেন আশাপূর্ণার বয়স তখন সাড়ে পাঁচ বছর। কিন্তু বাল্যের ওই কয়েকটি বছর তার মনে গভীর ছাপ রেখে যায়। পরবর্তীকালে সাহিত্যেও নানা ভাবে এঁকেছিলেন ‘দেহে ও মনে অসম্ভব শক্তিমতী’ তার সেই ঠাকুরমার ছবি।



শৈশব ও শিক্ষা : প্রথাগত শিক্ষার সৌভাগ্য আশাপূর্ণার হয়নি ঠাকুরমার কঠোর অনুশাসনে। পরবর্তীজীবনে এক স্মৃতিচারণায় এই প্রসঙ্গে আশাপূর্ণা বলেছিলেন, “...ইস্কুলে পড়লেই যে মেয়েরা... বাচাল হয়ে উঠবে, এ তথ্য আর কেউ না জানুক আমাদের ঠাকুমা ভালোভাবেই জানতেন, এবং তাঁর মাতৃভক্ত পুত্রদের পক্ষে ওই জানার বিরুদ্ধে কিছু করার শক্তি ছিল না।” তবে এই প্রতিকূল পরিবেশেও মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে দাদাদের পড়া শুনে শুনে শিখে গিয়েছিলেন পড়তে। বর্ণপরিচয় আয়ত্ত করেছিলেন বিপরীত দিক থেকে।[৫] মা সরলাসুন্দরী ছিলেন একনিষ্ঠ সাহিত্য-পাঠিকা। সেই সাহিত্যপ্রীতি তিনি তার কন্যাদের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। সাধনা, প্রবাসী, ভারতবর্ষ, সবুজপত্র, বঙ্গদর্শন, বসুমতী, সাহিত্য, বালক, শিশুসাথী, সন্দেশ প্রভৃতি ১৬-১৭টি পত্রিকা এবং দৈনিক পত্রিকা হিতবাদী তো বাড়িতে আসতই, তাছাড়াও সরলাসুন্দরী ছিলেন স্বনামধন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, জ্ঞানপ্রকাশ লাইব্রেরি ও চৈতন্য লাইব্রেরির সদস্য। বাড়িতে সেযুগের সকল প্রসিদ্ধ গ্রন্থের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডারও ছিল। এই অণুকূল পরিবেশে মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই পাঠ্য ও অপাঠ্য নির্বিশেষে পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করে দেন আশাপূর্ণা। পরবর্তী কালে এই বাল্যকাল সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “হিসেব মতো আমার ছেলেবেলাটা কেটেছে, সংসার ঊর্ধ্বের একটি স্বর্গীয় জগতে। বই পড়াই ছিল দৈনিক জীবনের আসল কাজ।”

১৯২৪ সালে, মাত্র ১৫ বছর ৮ মাস বয়সে কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা কালিদাস গুপ্তের সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়।



আশাপূর্ণা দেবী রচিত গ্রন্থাবলি : সুবর্ণলতা , বকুলকথা , অগ্নিপরীক্ষা , গজ উকিলের হত্যা রহস্য , ভূতুরে কুকুর , শুক্তিসাগর , সুখের চাবি ,
বলয়গ্রাস , যোগবিয়োগ , নির্জন পৃথিবী , ছাড়পত্র , প্রথম লগ্ন , সমুদ্র নীল আকাশ নীল , উত্তরলিপি , তিনছন্দ , আর এক ঝড় , নদী দিক হারা , একটি সন্ধ্যা একটি সকাল , উত্তরণ , জহুরী , মায়াজাল ।




উল্লেখযোগ্য পুরস্কার

জ্ঞানপীঠ পুরস্কার ,  রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমী ফেলোশিপ



মৃত্যু : ১৩ই জুলাই,১৯৯৫



রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনীমুলক রচনা | Premendra Mitra

 

প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনীমুলক রচনা | Premendra Mitra

 


জন্ম ও বংশ-পরিচয় : প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯০৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে তাঁর পিতার কর্মস্থল বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন ৷ তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার রাজপুরে ৷ তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগরের সম্ভ্রান্ত মিত্র বংশের সন্তান ৷ তাঁর পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র এবং তাঁর মাতার নাম সুহাসিনী দেবী ৷ খুব অল্প বয়সেই তিনি মাতৃহারা হন |



সাহিত্যকর্ম :  প্রেমেন্দ্র মিত্র এক সময় কলকাতার ২৮ নম্বর গোবিন্দ ঘোষাল লেনের মেসবাড়িতে বাস করতেন ৷ পরবর্তীকালে পড়াশোনার জন্য তিনি ঢাকাতে থাকতে শুরু করেন ৷ একবার ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরে এসে ওই মেসবাড়ির ঘরের জানলার ফাঁকে একটি পোস্টকার্ড আবিষ্কার করেন । চিঠিটা পড়তে পড়তে তার মনে দুটো গল্প আসে । সেই রাতেই গল্পদুটো লিখে পরদিন পাঠিয়ে দেন জনপ্রিয় পত্রিকা প্রবাসীতে । ১৯২৪ সালের মার্চে প্রবাসীতে 'শুধু কেরানী' আর এপ্রিল মাসে 'গোপনচারিণী' প্রকাশিত হয়, যদিও সেখানে তার নাম উল্লেখ করা ছিল না। সেই বছরেই কল্লোল পত্রিকায় 'সংক্রান্তি' নামে একটি গল্প বেরোয়। এরপর তার মিছিল(1928) এবং পাঁক(১৯২৬) নামে দুটি উপন্যাস বেরোয়। পরের বছর বিজলী পত্রিকায় গদ্যছন্দে লেখেন 'আজ এই রাস্তার গান গাইব' কবিতাটি।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম কবিতার বই ‌'প্রথমা' প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। বৈপ্লবিক চেতনাসিক্ত মানবিকতা তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য | প্রথম জীবনে তার ছোটোগল্পের তিনটি বই বেরোয় - 'পঞ্চশর', 'বেনামী বন্দর' আর 'পুতুল ও প্রতিমা'। মানুষের সম্পর্কের ভাঙ্গা গড়া, মনের জটিলতা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ব্যথা বেদনার কথা প্রকাশে প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন স্বকীয়তায় অনন্য |

       

কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য :  প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রথম বাঙালি সাহিত্যিক যিনি নিয়মিত কল্পবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প-উপন্যাস রচনায় মনোনিবেশ করেন। তার বিজ্ঞান সাহিত্য রচনার শুরু ১৯৩০ সালে। রামধনু পত্রিকায় ক্ষিতীন্দ্রনারায়ন ভট্টাচার্য তাকে ছোটদের জন্যে লিখতে অনুরোধ করলে 'পিঁপড়ে পুরান' কাহিনীটি লেখেন। এটিই তার প্রথম কল্পবিজ্ঞান রচনা[৫]। 'কুহকের দেশে' গল্পে তার কল্পবিজ্ঞান ও এডভেঞ্চার কাহিনীর নায়ক মামাবাবুর আত্মপ্রকাশ। ১৯৪৮ সালে 'ড্র্যাগনের নিঃশ্বাস' বের হলে মামাবাবু পাঠক মহলে জনপ্রিয় হন। তার রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান গল্প ও উপন্যাসের নাম নিচে দেওয়া হল:

ছোটোগল্প: কালাপানির অতলে ,  দুঃস্বপ্নের দ্বীপ , যুদ্ধ কেন থামল , মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী , হিমালয়ের চূড়ায় , আকাশের আতঙ্ক , অবিশ্বাস্য , লাইট হাউসে  ইত্যাদি ।

বড়ো গল্প ও উপন্যাস: পিঁপড়ে পুরাণ, পাতালে পাঁচ বছর, ময়দানবের দ্বীপ, শুক্রে যারা গিয়েছিল, মনুদ্বাদশ, সূর্য যেখানে নীল।

এছাড়া আকাশবাণীর উদ্যোগে লিখিত "সবুজ মানুষ" নামে একটি চার অধ্যায়ের বারোয়ারি কল্পবিজ্ঞান কাহিনির প্রথম অধ্যায় রচনা করেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। অবশিষ্ট তিনটি অধ্যায় লিখেছিলেন অদ্রীশ বর্ধন, দিলীপ রায়চৌধুরী ও সত্যজিৎ রায়।




চলচ্চিত্র জগৎ :  পথ বেঁধে দিল, রাজলক্ষ্মী (হিন্দি), নতুন খবর, চুপি চুপি আসে, কালোছায়া, কুয়াশা, হানাবাড়ী, তাঁর পরিচালিত ছবি। এছাড়াও তিনি বহু সিনেমার কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার ও উপদেষ্টা ছিলেন।


 পুরস্কার : রবীন্দ্র পুরস্কার ,
আকাদেমি পুরস্কার ,পদ্মশ্রী ,
দেশিকোত্তম


মৃত্যু :  কলকাতায় পাকস্থলীর ক্যান্সারের কারণে অসুস্থ হয়ে ৩ মে, ১৯৮৮ মারা যান। ভগ্নস্বাস্থ্যেও সৃষ্টিশীল ছিলেন ১৯৮৭ পর্যন্ত।






/>

শনিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২১

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনী মূলক রচনা । Tarashankar Bondopaddhay

 

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনী মূলক রচনা । Tarashankar Bondopaddhay

 



জন্ম ও শিক্ষা : ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মায়ের নাম হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রভাবতী দেবী। তাদের বাড়িতে নিয়মিত কালী ও তারা মায়ের পুজো হতো। তার বাবা মা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও আদর্শনিষ্ঠ। তারাশঙ্করের জন্মগ্রহণ করার আগে প্রভাবতী দেবী ও হরিদাসের জ্যেষ্ঠপুত্রের মৃত্যু হয়। তাই তাদের পরিবারে তারা মায়ের পুজো শুরু হওয়ার ঠিক দশমাস পরে তারাশঙ্করের জন্ম হয়৷তিনি মায়ের দয়ায় জাত হয়েছিলেন বলেই তার নাম রাখা হয় তারাশঙ্কর। তারাশঙ্কর ছোটবেলায় মাদুলি, তাবিচ, কবচ এবং বহু সংস্কারের গন্ডিতে বড় হয়ে ওঠেন। আসলে সততা, ধর্মভাব, ভক্তি ও ধর্মশাস্ত্রীয় বিশ্বাস তিনি পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। যদিও পরবর্তী জীবনে এ সব বিশ্বাস নিয়ে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব ও জিজ্ঞাসা তার মনকে আলোড়িত করেছে। প্রগতিশীল চিন্তার শরিক হয়েছেন। তারাশঙ্করের বাল্যজীবন কাটে গ্রামের পরিবেশেই গ্রামের স্কুল থেকে।

তারাশঙ্কর লাভপুরের যাদবলাল হাই স্কুল থেকে ১৯১৬ সালে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এবং পরে সাউথ সুবার্বন কলেজে (এখনকার আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন। তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। স্বাস্থ্যভঙ্গ এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপের কারণে তার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।

ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রেপ্তার হলেও পরে মুক্তি পেয়ে যান। এরপর নিজেকে সাহিত্যে নিয়োজিত করেন। ১৯৩২ সালে তিনি প্রথমবার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করেন। একই বছরে তার প্রথম উপন্যাস "চৈতালী ঘূর্ণি" প্রকাশ পায়।

তারাশঙ্কর ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে বাগবাজারে একটি বাড়ি ভাড়া করে নিজের পরিবারকে কলকাতায় নিয়ে আসেন ও ১৯৪১-এ তিনি বরাহনগরে চলে যান। তারাশঙ্কর ১৯৪২-এর বীরভূম জেলা সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন এবং ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংগঠনের সভাপতি হন।[২] তিনি ১৯৭০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।



রাজনৈতিক জীবন : তারাশঙ্কর কংগ্রেসের কর্মী হয়ে সমাজসেবামূলক কাজ করেন এবং এর জন্য তিনি কিছুদিন জেলও খাটেন। একবার তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধান পরিষদের সদস্য হন।



লেখার বৈশিষ্ট্য    : তার লেখায় বিশেষ ভাবে পাওয়া যায় বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের সাঁওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউরি, ডোম, গ্রাম্য কবিয়াল সম্প্রদায়ের কথা। ছোট বা বড় যে ধরনের মানুষই হোক না কেন, তারাশঙ্কর তার সব লেখায় মানুষের মহত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তার লেখার সবচেয়ে বড় গুণ। সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন চিত্র তার অনেক গল্প ও উপন্যাসের বিষয়। সেখানে আরও আছে গ্রাম জীবনের ভাঙনের কথা, নগর জীবনের বিকাশের কথা।

চলচ্চিত্র : তারাশঙ্করের উপন্যাস, গল্প ও নাটক নিয়ে চল্লিশটিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সত্যজিৎ রায়ও তারাশঙ্করের জলসাঘর এবং অভিযান উপন্যাসের সফল চিত্ররূপ দিয়েছেন। তার যেসব রচনা চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে সেগুলির মধ্যে আছে: জলসাঘর , অভিযান ইত্যাদি ।





রচিত গ্রন্থাবলি :  উপন্যাস , নিশিপদ্ম ,চৈতালি ঘূর্ণি ,পাষাণপুরী ,নীলকণ্ঠ ,ধাত্রীদেবতা ,গণদেবতা ,মন্বন্তর ,পঞ্চগ্রাম ,কবি ,অভিযান ,হাঁসুলীবাঁকের উপকথা ,



ছোটোগল্প :  জলসাঘর , প্রতিধ্বনি ,কামধেনু , বিষপাথর
 




পুরস্কার : ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে “রবীন্দ্র পুরস্কার” লাভ করেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে “সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার” পান। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীন ভ্রমণে যান। এর পরের বছর তিনি অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সঙ্ঘের কমিটি গঠনের প্রস্ততিমূলক সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন গমণ করেন। এর পর তিনি তাসখন্দে অনুষ্ঠিত অ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে তারাশঙ্কর ভারত সরকারের পদ্মশ্রী ও ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন।

শরৎস্মৃতি পুরস্কার , জগত্তারিণী স্মৃতিপদক , রবীন্দ্র পুরস্কার , সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার , জ্ঞানপীঠ পুরস্কার , পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ উপাধি



মৃত্যু : সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১ সালে ।

 

 

 

 

শুক্রবার, ২৬ মার্চ, ২০২১

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনীমূলক রচনা । Bibhutibhushan Bandyopadhyay Biography Bengali







জন্ম ও পরিবার    :  বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরাতিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বনগাঁ'র নিকট বারাকপুর গ্রামে। তবে তাঁদের আদিবাস ছিল উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বসিরহাট মহকুমার অন্তর্গত পানিতর গ্রাম৷ তাঁর পিতামহ ছিলেন কবিরাজ এবং তিনি বনগাঁর নিকট ব্যারাকপুর গ্রামে কবিরাজি করতে আসতেন৷ তাঁর পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত। পাণ্ডিত্য এবং কথকতার জন্য তিনি শাস্ত্রী উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। মাতা মৃণালিনী দেবী। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ জ্যেষ্ঠ ছিলেন।


শিক্ষাজীবন : পিতার কাছে বিভূতিভূষণের পড়ালেখার পাঠ শুরু হয়। এরপর নিজ গ্রাম ও অন্য গ্রামের কয়েকটি পাঠশালায় পড়াশোনার পর " বনগ্রাম উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে" ভর্তি হন। সেখানে তিনি অবৈতনিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় পিতা মারা যান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স এবং ১৯১৬ সালে কলকাতা'র রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ ) থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৮ সালে একই কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষায়ও ডিস্টিংশনসহ পাশ করেন। এরপর তিনি এমএ ও আইন বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে দেন ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে।



বিবাহ : ১৯১৯ সালে হুগলী জেলার জাঙ্গীপাড়ায় দ্বারকানাথ হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ানোর সময় বসিরহাটের মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা গৌরী দেবীর সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের এক বছর পরই গৌরী দেবী মারা যান। স্ত্রীর শোকে তিনি কিছুদিন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন। পরে ১৩৪৭ সালের ১৭ অগ্রহায়ণ (ইংরেজি ৩ ডিসেম্বর, ১৯৪০) তারিখে ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে রমা দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের সাত বছর পর একমাত্র সন্তান তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (ডাকনাম বাবলু) জন্মগ্রহণ করেন।



কর্মজীবন: শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। এসময় কিছুদিন গোরক্ষিণী সভার প্রচারক হিসেবে বাংলা, ত্রিপুরা ও আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। পরে খেলাৎচন্দ্র ঘোষের বাড়িতে সেক্রেটারি, গৃহশিক্ষক এবং তার এস্টেটের ভাগলপুর সার্কেলের সহকারী ম্যানেজারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন আবার ধর্মতলার খেলাৎচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর যোগ দেন বনগাঁর নিকট গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশন স্কুলে। এই স্কুলেই তিনি আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন। এই মহান কথাসাহিত্যিক ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর তারিখে বিহারের (বর্তমানে ঝাড়খন্ড) ঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার বাড়িটির নাম স্ত্রীর নামে "গৌরীকুঞ্জ" রেখেছিলেন।


সাহিত্যকর্ম: ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩২৮ বঙ্গাব্দ) প্রবাসী পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় উপেক্ষিতা নামক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। ভাগলপুরে কাজ করার সময় ১৯২৫ সালে তিনি পথের পাঁচালী রচনা শুরু করেন। এই বই লেখার কাজ শেষ হয় ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে। এটি বিভূতিভূষণের প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা। সাহিত্যিক-সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এই লেখাটি পছন্দ করে বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশ করলে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালী উপন্যাসের কাহিনীকে চলচ্চিত্রে রূপদানের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা করেছিলেন। এই সিনেমাটির নামও ছিল পথের পাঁচালী। এই চলচ্চিত্রটি দেশী-বিদেশী প্রচুর পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছিল। এরপর "অপুর সংসার" টেমপ্লেট:The world of apu আর "অপরাজিত" রচনা করেন, যেগুলি "পথের পাঁচালির"ই পরবর্তী অংশ। সত্যজিৎ এই দুটি গল্প নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উভয় উপন্যাসেই তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। পথের পাঁচালী উপন্যাসটি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা এবং ইংরেজি ও ফরাসি সহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিভূতিভূষণের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি



 গল্পগ্রন্থ হল: মেঘমল্লার, মৌরীফুল, যাত্রাবদল। তার লেখা চাঁদের পাহাড় একটি অনবদ্য এ‍্যাডভেঞ্চার কাহিনী, যার পটভূমি আফ্রিকা। ২০১৩ সালে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখার্জী "চাঁদের পাহাড়"টেমপ্লেট:"Chander Pahar"কে বাংলা চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেন। এই চলচ্চিত্রটিও বাংলা চলচ্চিত্র জগতে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করে।



পুরস্কার ও সম্মাননা : উপন্যাসের জন্য।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার (লেখকের জন্মস্থান) পারমাদান বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নাম লেখকের সম্মানার্থে রাখা হয়েছে "বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য"।



গ্রন্থতালিকা : উপন্যাস , পথের পাঁচালি , অপরাজিত , দৃষ্টিপ্রদীপ , আরণ্যক , দেবযান ,





কিশোরপাঠ্য : চাঁদের পাহাড় ,আইভ্যানহো ,মরণের ডঙ্কা বাজে,মিসমিদের কবচ, হীরা মাণিক জ্বলে,সুন্দরবনের সাত বৎসর



মৃত্যু : অধুনা ঝাড়খন্ডের ঘাটশিলাতে,) পহেলা নভেম্বর ১৯৫০ (১৭ই কার্তিক ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ,বুধবার ) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। পরদিন দুপুরে সুবর্ণরেখা নদীর ওপরে 'পঞ্চপাণ্ডব ঘাট'-এ তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

< />






/>

মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

মুজিবুর রহমান জীবনীমূলক রচনা | Mujibur Rahman Biography in Bengali







/> 

ভূমিকাঃ পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে আজ অবধি যুগে যুগে এমন সব ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, যাদের হাত ধরে মানবতার মুক্তির সনদ রচিত হয়েছে। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের এই ছোট্ট ভূ-খন্ডটির জন্মের সাথে যার নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তিনি আর কেউ নন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

 

 

জন্ম ও শৈশবঃ গোপালগঞ্জ জেলার মধুমতি নদীর তীরবর্তী টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে শেখ লুৎফুর রহমান ও সাহেরা খাতুনের ঘর আলোকিত করে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ (বাংলা ২০ চৈত্র ১৩৫৯) শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে গ্রামের অন্য দশটি সাধারণ ছেলের মতো হেসে-খেলে দুরন্তপনায়।

 

/> 

শিক্ষা জীবনঃ শেখ মুজিব প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। অতঃপর গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ (এইচএসসি) এবং ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে বিএ পাস করেন। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। উল্লেখ্য ৬১ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেখ মুজিবুর রহমানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় ১৪ আগস্ট, ২০১০ সালে।

 

 

বৈবাহিক জীবনঃ ১৯৩৯ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে শেখ মুজিবুর রহমান শেখ ফজিলাতুন্নেসাকে বিয়ে করেন। তাদের ঘর আলোকিত করেছে তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এবং দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

 

 

বৈপ্লবিক রাজনৈতিক জীবনঃ ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ। রাজনীতি যেন তাঁর রক্তে মিশে আছে। তিনি উপলব্ধি করতেন যে, রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই বৃহৎ কল্যাণ সম্ভব। তাইতো এ দেশের সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি সবসময় অগ্রভাগে ছিলেন। গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য সাত দিন কারাভোগ করেন।

 

 

- নেতৃত্বগুণের কারণে ১৯৪৬ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

 

- ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) প্রতিষ্ঠা করেন।

 

 

- ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পিকেটিং এর সময় গ্রেফতার হন।

 

 

- ১৯৪৯ সালে মাওলানা ভাসানীর সাথে ভূখা মিছিলে নেতৃত্ব দান কালে গ্রেফতার হন।

 

 

- ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ এর জন্ম হলে কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

 

- ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

 

- ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের লাহোরে বাঙালির মুক্তিসনদ ছয় দফা উত্থাপন করেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বৃহৎ অংশ মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে কাটান।

 

 

- ১৯৬৮ সালে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাভোগ করেন।

 

 

- এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হন।

 

 

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধুঃ শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণমানুষের নেতা। তিনি যেমন নিঃস্বার্থভাবে জনকল্যাণের রাজনীতি করতেন তেমন জনগণের ভালোবাসাও পেয়েছেন। তার মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিশাল মিছিল, ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ-অনশন তারই প্রমাণ। তিনি ছিলেন জনগণের বন্ধু। এর স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন ঢাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই উপাধিটি যে কেবল তার জন্যই যথাযথ ছিল তার প্রমাণ হলো পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুই তাঁর নাম হয়ে যাওয়ায়।

 

 

বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতাঃ বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ জাতির কল্যাণে চিন্তামগ্ন থাকতেন। ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ শহিদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুদিবসে তিনি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের নামকরণ করেন “বাংলাদেশ” নামে। যা তাকে পিতার ভূমিকায় নিয়ে যায়। তাই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ঢাকসু’র ভিপি আসম আব্দুর রব বঙ্গবন্ধু শেখ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক’ উপাধি দেন।

 

/> 

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণঃ ৭ই মার্চ, বাঙালি জাতির নতুন দিগন্তের সূচনার এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন- “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। তবু এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

 

 

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুঃ ৭ই মার্চের ভাষণ থেকেই আঁচ করা যায় যে তিনি আগাম যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়েছেন। ২৫ মার্চ রাত্রে গ্রেফতারের পূর্বমুহূর্তে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, This is my last message to you. From today Bangladesh is independent. তার ডাকে সমগ্র বাঙালি মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

/> 

 

রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবঃ বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় সমবায়, কৃষি ও বন বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালের প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় শিল্প, শ্রম ও দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তিনি পার্লামেন্টারি দলের নেতা নির্বাচিত হন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা না ছাড়তে চাইলে এর পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বও গ্রহণ করেন।

 

 

/>স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও দেশ গঠনঃ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের করাচির মিওয়ালী কারাগারে বন্দি থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশে পর্দাপণ করেন বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, কল্যাণকামী স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লাখো মানুষের ঢল বেয়ে মহান নেতা আসলেন চিরচেনা সেই রেসকোর্স ময়দানে। দিলেন দেশ গড়ার দিক নির্দেশনা। ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সহযোগীতা চেয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন এক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যেখানে সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। আর এ জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

 

 

/>বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধুঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও রসিক মানুষ। দেশের গন্ডি পেরিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সভায়ও সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন। তিনিই প্রথম ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি ১৯৭২ সালে বিশ্বশান্তি পরিষদের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘জুলিও কুরী’ পুরস্কার লাভ করেন।

 

 

অবেলায় বিদায়ঃ বাংলার ইতিহাসে জঘন্যতম দিন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। যার অঙ্গুলী হিলনে কোটি মানুষ প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই মহামানবকে কতিপয় নরপিশাচ স্বপরিবারে হত্যা করে বাংলার মাটিকে কলঙ্কিত করে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার কতিপয় মানুষ নামের জানোয়ারেরা পিতৃহত্যার মতো ঘৃণ্য কাজের মাধ্যমে তাঁর স্বপ্নকে বিলীন করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। কারণ তার স্বপ্ন সারথীরা আজও জেগে আছে।

/> 

 

শেষ কথাঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহানুভবতা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছেন- “আমি হিমালয় দেখিনি, আমি দেখেছি শেখ মুজিবকে।” উপসংহারের উপকূলে দাঁড়িয়ে তাই বলতে হয়- “যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরি, যমুনা বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

 

সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৯

বাংলা কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জীবনী

sarat-chandra-chattopadhyay-biography


জন্ম ও পরিবার :- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। পাঁচ ভাই আর বোনের মধ্যে শরৎচন্দ্র ছিলেন দ্বিতীয়। তার দিদি অনিলা দেবী ছাড়াও প্রভাসচন্দ্র ও প্রকাশচন্দ্র নামে তার দুই ভাই ও সুশীলা দেবী নামে তার এক বোন ছিল। শরৎচন্দ্রের ডাকনাম ছিল ন্যাঁড়া। দারিদ্র্যের কারণে মতিলাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভাগলপুরে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন বলে শরৎচন্দ্রের শৈশবের অধিকাংশ সময় এই শহরেই কেটেছিল।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন  :-  শরৎচন্দ্রের পাঁচ বছর বয়সকালে মতিলাল তাকে দেবানন্দপুরের প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন, যেখানে তিনি দু-তিন বছর শিক্ষালাভ করেন। এরপর ভাগলপুর শহরে থাকাকালীন তার মামা তাকে স্থানীয় দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয়ে ছাত্রবৃত্তিতে ভর্তি করিয়ে দেন। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে শরৎচন্দ্র ভাগলপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে মতিলালের ডিহিরির চাকরি চলে গেলে তিনি তার পরিবার নিয়ে দেবানন্দপুরে ফিরে গেলে শরৎচন্দ্র জেলা স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই সময় তিনি হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের ফি দিতে না-পারার কারণে তাকে এই বিদ্যালয়ও ত্যাগ করতে হয়। এই সময় তিনি 'কাশীনাথ' ও 'ব্রহ্মদৈত্য' নামে দুটি গল্প লেখেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে মতিলাল পুনরায় ভাগলপুর ফিরে গেলে প্রতিবেশী সাহিত্যিক তথা তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় শিক্ষালাভের প্রতি শরৎচন্দ্রের আগ্রহ লক্ষ করে তাকে তার বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। এই বিদ্যালয় থেকে ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষা পাস করে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে ভর্তি হন। এই সময় তিনি তার মাতামহের ছোটো ভাই অঘোরনাথের দুই পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ও গিরীন্দ্রনাথকে প্রতি রাতে পড়াতেন, তার বিনিময়ে অঘোরনাথ তার কলেজে পড়ার প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাতেন। এতৎসত্ত্বেও এফএ পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না-পারার জন্য তিনি পরীক্ষায় বসতে পারেননি।

[ ] কলেজ ত্যাগ করার পর শরৎচন্দ্র ভাগলপুর শহরের আদমপুর ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে খেলাধুলো ও অভিনয় করে সময় কাটাতে শুরু করেন। এই সময় প্রতিবেশী বিভূতিভূষণ ভট্টের বাড়িতে একটি সাহিত্যসভার আয়োজন করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে তিনি বড়দিদি, 'দেবদাস', চন্দ্রনাথ, শুভদা ইত্যাদি উপন্যাস এবং 'অনুপমার প্রেম', আলো ও ছায়া, 'বোঝা', হরিচরণ' ইত্যাদি গল্প রচনা করেন। এই সময় তিনি বনেলী রাজ-এস্টেটে কয়েকদিন চাকরি করেন। কিন্তু পিতার ওপর কোনো কারণে অভিমানবশত তিনি সন্ন্যাসী সেজে ঘর ছেড়ে চলে যান। এই সময় তার পিতার মৃত্যু হলে তিনি ভাগলপুর ফিরে এসে পিতার শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করে কলকাতা যাত্রা করেন, যেখানে তিনি কলকাতা উচ্চ আদালতের উকিল লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে হিন্দি বইয়ের ইংরেজি তর্জমা করার জন্য মাসে ত্রিশ টাকা বেতনের চাকরি পান। এই সময়, তিনি 'মন্দির' নামে একটি গল্প লিখে 'কুন্তলীন' প্রতিযোগিতায় পাঠালে তা বিজয়ী ঘোষিত হয় ।

[ ] ছয় মাস লালমোহনের বাড়িতে কাটানোর পর শরৎচন্দ্র ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রেঙ্গুনে লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের ভগ্নিপতি উকিল অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে চলে যান। অঘোরনাথ তাকে বর্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে একটি অস্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। দুই বছর পর তার চাকরি চলে গেলে তিনি তার বন্ধু গিরীন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে পেগু চলে যান ও সেখানে অবিনাশ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে বসবাস করেন। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বর্মার পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসের ডেপুটি একজামিনার মণীন্দ্রনাথ মিত্রের সাহায্যে শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে এই অফিসে চাকরি পান ও পরবর্তী দশ বছর এই চাকরি করেন।

[ ] ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে শরৎচন্দ্র এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফিরে এলে 'যমুনা' নামে পত্রিকার সম্পাদক ফনীন্দ্রনাথ পাল তাকে পত্রিকার জন্য লেখা পাঠাতে অনুরোধ করেন। সেই অনুযায়ী, শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে ফিরে গিয়ে রামের সুমতি গল্পটি পাঠিয়ে দেন, যা যমুনা পত্রিকায় ১৩১৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন ও চৈত্র্য সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি 'ভারতবর্ষ' পত্রিকার জন্যেও লেখা পাঠাতে শুরু করেন। ফনীন্দ্রনাথ পাল তার উপন্যাস বড়দিদি পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। এমসি সরকার অ্যান্ড সন্স ও গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স তার উপন্যাসগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছুটি নিয়ে মনোমালিন্যের কারণে শরৎচন্দ্র চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রেঙ্গুন বাংলায় ফিরে আসেন।


শেষ জীবন :- মধ্যবয়সে শরৎচন্দ্র হাওড়া জেলার পানিত্রাস (সামতাবেড়) গ্রামের মাটির বাড়িতে বাস করতেন। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের দেউলটি স্টেশন থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটারের পথ সামতাবেড়ের বাড়িটা রূপনারায়ণ নদের তীরে এক মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। পাশাপাশি দুটো পুকুরে সানের ঘাট, বাগান, ডালিম, পেয়ারা গাছে ঘেরা। ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘরভাঙানি বন্যায় পাশাপাশি সব গাঁয়ের মাটির বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। শরৎচন্দ্রের মাটির বাড়িটা রূপনারায়ণের কূলে থেকেও আশ্চর্যজনকভাবে রক্ষা পেয়ে যায়। জানালা পর্যন্ত ভিতটা ইঁট-সিমেন্টে গাঁথা ছিল বলে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পড়ে যায়নি। পরে সরকারি উদ্যোগে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র শিবপুরেও থাকতেন। শিবপুর ব্যাতাইতলা বাজার থেকে চ্যাটার্জিহাট পর্যন্ত রাস্তা শরৎচন্দ্রের নামেই চালু আছে। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শরৎচন্দ্র প্রায়শই অসুস্থ থাকতেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি স্বাস্থ্য উদ্ধারের উদ্দেশ্যে দেওঘরে তিন চার মাস কাটিয়ে কলকাতা ফিরে এলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময় তার যকৃতের ক্যান্সার ধরা পড়ে, যা তার পাকস্থলী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বিধানচন্দ্র রায়, কুমুদশঙ্কর রায় প্রমুখ চিকিৎসক তার অস্ত্রোপচারের পক্ষে মত দেন। চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথমে দক্ষিণ কলকাতার সাবার্বান হসপিটাল রোডের একটি ইউরোপীয় নার্সিং হোমে ও পরে ৪ নম্বর ভিক্টোরিয়া টেরাসে অবস্থিত পার্ক নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জানুয়ারি শল্য চিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তার দেহে অস্ত্রোপচার করেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। চার দিন পর ১৬ জানুয়ারি সকাল দশটায় শরৎচন্দ্র শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ।


উপন্যাস :- তিনি ২০ টি উপন্যাস লিখেন সেগুলি হলো  বড়দিদি, বিরাজবৌ, পন্ডিতমশাই, পল্লী-সমাজ, চন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত-প্রথম পর্ব, দেবদাস, চরিত্রহীন, দত্তা, শ্রীকান্ত-দ্বিতীয় পর্ব, গৃহদাহ, বামুনের মেয়ে, দেনা পাওনা, নব-বিধান, পথের দাবী, শ্রীকান্ত-তৃতীয় পর্ব, শেষ প্রশ্ন, শ্রীকান্ত-চতুর্থ পর্ব, বিপ্রদাস, শুভদা, 
নাটক:- নাটক ৪ টি রচনা করেন সেগুলি হলো ষোড়শী, রমা, বিরাজ বউ, বিজয়া, 
গল্প :-  ২১ ছোটো গল্প রচনা করেন এবং তাঁর রচিত গল্প গুলি বাংলা সাহিত্যে তাকে এক অন্য মর্যাদা দিয়েছে । তার লেখা গল্প গুলি হলো
রামের সুমতি ,পরিণীতা, বিন্দুর ছেলে, পথ-নির্দেশ, মেজদিদি, আঁধারে আলো ,দর্পচূর্ণ ,বৈকুণ্ঠের উইল, অরক্ষণীয়া, নিষ্কৃতি, কাশীনাথ, স্বামী, ছবি, বিলাসী, মামলার ফল, হরিলক্ষ্মী, মহেশ, অভাগীর স্বর্গ, অনুরাধা, সতী, পরেশ, 
প্রবন্ধ:- তিনি ১২ টি প্রবন্ধ রচনা করেন সেগুলি হলো  নারীর মূল্য,তরুণের বিদ্রোহ, স্বদেশ ও সাহিত্য, স্বরাজ সাধনায় নারী, শিক্ষার বিরোধ,স্মৃতিকথা,অভিনন্দন,ভবিষ্যৎ বঙ্গ-সাহিত্য,গুরু-শিষ্য সংবাদ,সাহিত্য ও নীতি,সাহিত্যে আর্ট ও দুর্নীতি,ভারতীয় উচ্চ সঙ্গীত,

চলচ্চিত্রায়ণ :- তার সাহিত্য-কর্মকে ঘিরে ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন ভাষায় তৈরি হয়েছে । তার মধ্যে 'দেবদাস' উপন্যাসটি বাংলা, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষায় আটবার তৈরি হয়। এছাড়াও তার যেসমস্ত গল্প এবং উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে  সেগুলি হলো বড়দিদি , পরিণীতা , রজলক্ষ্মী-শ্রীকান্ত , মাঝলি দিদি , স্বামী, বিন্দুর ছেলে ।

[ ] বাংলা সাহিত্যে কথা শিল্পী হিসেবে তিনি এক উজ্জ্বল স্থান পেয়েছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে । তার ছোটো গল্প গুলো মানুষের খুব কাছের হয়ে থেকে গেছে ।

মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মহাত্মা গান্ধীজী জীবনী মূলক রচনা

mohatma-gandhi-biography

সমার্থক বিশেষিত নাম : মহাত্মা, মহাত্মা গান্ধী, বাপুজী, গান্ধিজী। ভারত নামক রাষ্ট্রের জনক হিসাবে স্বীকৃত।
১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২রা অক্টোবরে গুজরাটের সমুদ্র-উপকূলীয় শহরে পোরবন্দরের পৈত্রিক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন হিন্দু মোধ গোষ্ঠীর। ইনি পোরবন্দর রাজ্যের দেওয়ান ছিলেন। মায়ের নাম পুতলি বাই। ইনি ছিলেন প্রণামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর কন্যা। পিতা করমচাঁদের চতুর্থ স্ত্রী। উল্লেখ্য এঁর আগের তিনজন স্ত্রী সন্তান প্রসবকালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ইনি তাঁর বাবা মায়ের পছন্দে ১৪ বৎসর বয়সী কস্তুর বাইকে বিয়ে করেন। এঁদের চার পুত্র সন্তান জন্মেছিল। এঁদের নাম ছিল যথাক্রমে– হরিলাল গান্ধী (জন্ম ১৮৮৮), মনিলাল গান্ধী (জন্ম ১৮৯২), রামদাস গান্ধী (জন্ম ১৮৯৭) এবং দেবদাস গান্ধী (জন্ম ১৯০০) সালে।

১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ইনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় (ম্যাট্রিকুলেশন ) পাশ করেন রাজকোট হাইস্কুল থেকে। এরপর কিছুদিন তিনি গুজরাটের ভবনগরের সামালদাস কলেজ ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করেন। ১৮৮৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে ভর্তি হন। উল্লেখ্য ইংল্যান্ডে যাবার আগে জৈন সন্ন্যাসী বেচার্জীর সামনে তিনি তার মায়ের কাছে শপথ করেছিলেন যে, তিনি কখনো মাংস, মদ খাবেন না এবং হিন্দু নৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে চলবেন। এই কারণে তিনি লন্ডনের গুটি কয়েক নিরামিষভোজী খাবারের দোকানে আহর করতেন। এই সূত্রে তিনি নিরামিষভোজী সংঘে যোগ দেন এবং ওই সমিতির কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি এই সংঘের একটি স্থানীয় শাখাও প্রচলন করেন। নিরামিষভোজী অনেক সদস্যই আবার থিওসোফিক্যাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন। উল্লেখ্য ১৮৭৫ সালে এই সংঘটি স্থাপিত হয়েছিল। এই সংঘে বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মীভিত্তিক সাহিত্য পড়ানো হত। এই সংঘের অনুপ্ররণায় তিনি ভগবত গীতা পাঠ করেছিলেন। পরে তিনি খিষ্টান, বৌদ্ধ, ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা করেন।


১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে ব্যারিষ্টার হন এবং জুন মাসে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতিমধ্যে দেশে ফিরে ইনি তাঁর মৃত্যু সংবাদ পান। ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার জন্য, তাঁর জ্ঞাতিগোষ্ঠীর কিছু লোক, তাঁকে জাতিচ্যুতের রায় দিয়েছিলেন। এ কারণে জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল।

প্রথমে ইনি বোম্বাই আদলতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু লাজুক থাকার কারণে ইনি এই আদালতে বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেন নি। এরপর ইনি রাজকোটে ফিরে আসেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে তিনি এক বছরের জন্য Dada Abdulla Co. নামক একটি ভারতীয় কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালে যান। এই কোম্পানির অংশীদার আব্দুল করিম জাভেরি তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত অফিসের মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। এরপর প্রায় ২১ বৎসর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাতে কাটান।

তিনি নাটালের সুপ্রিম কোর্টে সর্বপ্রথম ভারতীয় আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্ত হন। সেসময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ভোটাধিকার ছিল না। এই অধিকার আদায়ের বিল উত্থাপিত হলে, তা আদালত বাতিল করে দেয়। এই বিষয়টির সূত্রে তিনি সে সেদেশের ভারতীয়দেরকে অধিকার সচেতন করে তুলেছিল। ১৮৯৪ সালে তাঁর নেতঋত্বে নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায়, ১৮৯৫ দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে প্রথমেই তিনি ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শেতাঙ্গদের বৈষম্য আচরণ লক্ষ্য করেন। ১৮৯৫ সালে কিছু ঘটনায় তাঁকে ক্রমে ক্রমে প্রতিবাদী করে তোলে। এখানে তিনি একদিন ডারবানের আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট তার পাগড়ি সরিয়ে ফেলতে বলেন। গান্ধী তা অগ্রাহ্য করেন এবং এই কারণে আদালত কক্ষ থেকে ক্ষোভে বেরিয়ে পড়েন। পিটার ম্যারিজবার্গের একটি ট্রেনের ভ্রমণ করার সময় প্রথম শ্রেণীর বৈধ টিকিট থাকা স্বত্ত্বেও, প্রথম শ্রেণীর কামড়া থেকে তৃতীয় শ্রেণীর কামড়ায় যেতে বাধ্য করা হয়। স্টেজকোচে ভ্রমণের সময় এক ইউরোপীয় যাত্রীকে জায়গা না দেওয়ার জন্য করে দেয়ার জন্য, তাঁকে ফুট বোর্ডে চড়তে বলা হলে, তিনি তা অস্বীকার করেনি।

১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সংক্ষিপ্ত সফর করেন। এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে ভারতে আন্দোলন করেন। এই কারণে ১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে যখন তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আবার দক্ষিণ আফ্রিকা যান, তখন এই সময় প্রবাসী ভারতীয়দের দ্বারা নেতা হিসাবে সম্বর্ধনা পান।
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বেয়ার যুদ্ধের সময় ইনি ভারতীয়দের দ্বারা একটি এ্যাম্বুলেন্স বাহিনী গঠন করেন। এই কারণে ইনি যুদ্ধ পদক লাভ করেন। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। এই সময় ট্র্যান্সভালে এশীয়দের বিরুদ্ধে আইন প্রবর্তনের বিপক্ষে আন্দোলন করেন। এই কারণে ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে প্রবাসী ভারতীয়দের দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে, আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যান। এবার ইনি ট্র্যান্সভালে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্ত হন। ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জোহান্সবার্গে প্লেগ দেখা দিলে তিনি একটি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন। ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে জুলু বিদ্রোহ শুরু হলে, আহতদের সেবার জন্য একটি ভারতীয় বাহিনী তৈরি করে, সেবা প্রদান করেন।

১৯০৬ সালে ট্র্যান্সভাল সরকার উপনিবেশের ভারতীয়দের নিবন্ধনে বাধ্য করানোর জন্য একটি আইন পাশ করে। ১১ই সেপ্টেম্বর জোহানেসবার্গের এক সভায় তিনি সবাইকে এই আইন বর্জন করতে বলেন। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে নিষ্ক্রিয় আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এ সময় আইন অম্যান্য করা, নিজেদের নিবন্ধন কার্ড পুড়িয়ে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক ভারতীয়কে বন্দী করা হয়। একই কারণে অনেক ভারতীয় হতাহত হন। শান্তিকামী ভারতীয়দের উপর এরূপ নিগীড়নমূলক আচরণের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় সাধারণ মানুষও প্রতিবাদ করা শুরু করে। সরকার ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে ট্র্যান্সভাল ত্যাগ করার জন্য আদেশ জারি করে। কিন্তু তিনি এই আদেশ অগ্রাহ্য করলে, তাঁর দুই মাসের কারাদণ্ড হয়। পরে জেনারেল স্মার্টস তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে একটি আপোষ রফায় আসেন এবং তাঁর কারাদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করেন। এই আপোষের কারণে ক্ষুব্ধ ভারতীয় পাঠানরা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেন। পরে স্মার্টস তাঁর আপোষ নাকচ করলে, ইনি পুনরায় নিষ্ক্রিয় আন্দোলন শুরু করেন। এই কারণে ইনি দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন।

১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে ডেপুটেশনে তিনি ইংল্যান্ড যান।নভেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জাহাজে ফিরবার সময়, তাঁর জীবনাদর্শ ও রাজনৈতিক মতবাদ সম্পর্কিত বই স্বরাজ রচনা করেন। এই গ্রন্থের অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ট্র্যান্সভালে জোহানিসবার্গের নিকট নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মীদের পরিবারের কর্মসসংস্থানের জন্য তলস্তয় নামক একটি খামার স্থাপন করেছিলেন। এই ফার্মের জন্য হেরম্যান কালেনবাক নামক একজন জার্মান স্থপতি এই খামারের জন্য ১১০০ একর জমি দান করেছিলেন।

১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইনি ইউরোপীয় পোশাক এবং দুধ পরিত্যাগ করেন। এই সময় থেকে তিনি শুকনো ও তাজা ফল খেয়ে জীবন ধারণের অভ্যাস করা শুরু করেন। এছাড়া সপ্তাহে ১ দিন অভ্যাস করেন। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ভারতীয়দের উপর মাথাপিছু ৩ পাউন্ড কর ধার্য করে। এই করারোপের প্রতিবাদে গান্ধীজী আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ২,০৪৭ জন পুরুষ, ১২৭ জন স্ত্রীলোক এবং ৫৭ জন ছেলেমেয়ে। এঁরা আন্দোলন করার জন্য ট্র্যান্সভালে প্রবেশ করলে, সরকার গান্ধীজীকে গ্রেফতার করে। এই আন্দোলনের কারণে তিনি দুই দফায় ৯ মাস ও ৩ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন। এরপর তিনি ইংল্যান্ডে যান।

১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেখানে ভারতীয়দের দ্বারা একটি এ্যাম্বুলেন্স বাহিনী তৈরি করেছিলেন। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সহায়তা করার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কাইসার-ই-হিন্দ স্বর্ণপদক প্রদান করে। এরপর ইনি ভারতে ফিরে আসেন এবং মে মাসে আহমেদাবাদ সবরমতী নদীর তীরে সত্যাগ্রহ আশ্রম স্থাপন করেন। ১৯১৫ -১৬ খ্রিষ্টাব্দে ইনি রেলপথে ভারত এবং বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) ভ্রমণ করেন।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বিদেশ প্রেরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সাফল্য লাভ করেন। এই বৎসরেই চরকায় সুতা কেটে সেই সুতা থেকে কাপড় তৈরির ধারণা লাভ করেন। এপ্রিল মাসে বিহারের চম্পাবরণে নীলচাষীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গ্রেফতার হন। পরে তাঁকে মুক্তিও দেওয়া হয়। এরপর তিনি বিহার সরকার কর্তৃক রায়তদের অবস্থা অনুসন্ধান কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে আহমেদাবাদ বস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য শ্রমিকদের নিয়ে আম্দোলন করেন। এই আন্দোলন সহজে মিটমাট হওয়ার জন্য উপবাসসহ প্রার্থনা করেন। এরপর শস্যহানির জন্য বোম্বাই জেলার খাজনা মওকুফের জন্য সত্যাগ্রহ করেন। দিল্লীতে ভাইসরয়ের যুদ্ধ পরিষদের সভায় তিনি হিন্দিতে বক্তৃতা দেন। পরে যুদ্ধে যোগদানের জন্য লোক সংগ্রহের জন্য কয়রা জেলা ভ্রমণ করেন।

১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে রাউটাল বিল বাতিলের জন্য দরখাস্ত করেন। এপ্রিল মাসে সর্বভারতীয় সত্যগ্রহ আন্দোলন শুরু হয়, এবং হরতাল পালিত হয়। এরপর পাঞ্জাবে তাঁর প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে, তিনি পাঞ্জাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই কারণে দিল্লী যাওয়ার পথে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ই এপ্রিল তারিখে জালিয়ানওয়ালাবাগে হত্যাকাণ্ডের পর গান্ধীজী সবরমতী আশ্রমে ৩ দিনের উপবাস করেন। ১৪ই এপ্রিল তারিখে নদিয়াদে স্বীকার করেন যে, সত্যাগ্রহ করে তিনি হিমালয়তূল্য ভুল করেছেন। এই বৎসরের সেপ্টেম্বর মাসে গুজরাটি ভাষায় নবজীবনপত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। উল্লেখ্য এই পত্রিকাটি পরে হিন্দি ভাষাতেই প্রকাশিত হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অক্টোবর মাসে তাঁর সম্পাদনায় ইংরেজি পত্রিকা 'ইয়ং ইন্ডিয়া' সম্পাদনা শুরু করেন। নভেম্বর মাসে দিল্লীতে নিখিল ভারত খিলাফত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় এবং সভার সভাপতিত্ব করেন গান্ধীজী। এই সময় মনটেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার গ্রহণ করার জন্য অমৃতসর কংগ্রেসকে পরামর্শ দেন।

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্কের সুলতানের খিলাফত অধিকার রক্ষার জন্য ভাইসরয়ের কাছে ডেপুটেশনের নেতৃত্ব দেন। এই বৎসরে ভাইসরয়ের কাছে কাইসার-ই-হিন্দ পদক, জুলু পদক ও বুর যুদ্ধ পদক প্রত্যার্পণ করেন। ডিসেম্বর মাসে নাগপুর কংগ্রেসের অধিবেশন ঘোষণা করা হয়।

১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাঝে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাহী দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। গুজরাটে তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস স্বরাজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন সংবিধান গ্রহণ করেন। একই সাথে টোকেন ফি দিতে রাজি হওয়া যে কোন ব্যক্তির জন্য দলের সদস্যপদ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।



১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাইসরয়কে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, গুজরাটের বরদৌলিতে সত্যাগ্রহ অভিযান চালনা করা হবে। কিন্তু ৫ই ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের চৌরিচোরাতে জনতা ২১জন কনস্টেবল ও একজন সাব ইন্সপেক্টরকে অগ্নিদগ্ধ করে মেরে ফেলেন। এই সহিংস ঘটনার জন্য টানা ৫ দিন উপবাস করেন। এরপর সত্যাগ্রহ আন্দোলন পরিত্যাগ করেন।
১৯২২ সালের ১০ মার্চ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৮ মার্চে বিচারে তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে পুনাতে তাঁর এপেনডিসাইটিসের অপারেশন করা হয় এবং ৫ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৮ই সেপ্টেম্বরের হিন্দু-মুসলিমদের বোধ ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য ২১ দিনের উপবাস করেন। ডিসেম্বর মাসে বেলগাঁও কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে নিখিল ভারত সুতাকাটা সমিতি স্থাপিত হয়। নভেম্বর মাসে আশ্রমবাসীদের একজন একটি অপকর্ম করে। এই কারণে গান্ধীজী ৭ দিন 'বদলি উপবাস' করেন। এই সময়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Story of my Experiments with Truthনামক গ্রন্থ রচনা শুরু করেন।

১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় কংগ্রেস অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে ঘোষণা করা হয়, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের শেষ হওয়ার আগে ভারতকে ডোমিনিয়ন স্টেটাস প্রদান না করলে, কংগ্রেস আন্দোলন করবেন। কিন্তু ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে লাহোরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ বা পূর্ণ স্বাধীনতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। ৩১ ডিসেম্বরে ভারতীয় পতাকার উন্মোচন কারা হয় লাহোরে।
১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি লাহোর মিলিত হয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দিনটিকে ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উৎযাপন করে। ফেব্রুয়ারি মাসে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি গান্ধীজী আইন অমান্য আন্দোলনের একনায়ক হিসাবে নিযুক্ত হন। মার্চ মাসের শুরুতে, ভাইসরয়কে এক চিঠিতে জানান যে, কংগ্রেসের দাবি না মানলে, তিনি লবণ আইন ভঙ্গ করার আন্দোলন শুরু করবেন। ১২ মার্চ তারিখে এলাহাবাদ থেকে ৪০০ কিলোমিটার হেঁটে ডান্ডি সমুদ্র সৈকতে পৌছান ৬ এপ্রিলে এবং লবণ সংগ্রহ শুরু করেন। এই সময় হাজার হাজার ভারতীয় তাঁর সাথে হেঁটে সাগরের তীরের পৌছান। উল্লেখ্য এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অন্যতম সফল প্রয়াস। ৫ মে তারিখে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিনা বিচারে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর ফলে সারা দেশে বিক্ষোভ হলে, প্রায় লক্ষাধিক আন্দোলনকারীকে গ্রফতার করা হয়।

ল্যাঙ্কশায়ারের ডারওয়েনে মহিলা বস্ত্রশ্রমিকদের সাথে, ১৯৩১১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ২৬ জানুয়ারিতে তিনি বিনা শর্তে মুক্তি লাভ করেন। এই সময় সরকার গান্ধীর সাথে সমঝোতা করার জন্য লর্ড এডওয়ার্ড আরউইনকে প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ করে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বড়লাট লর্ড আরউইনের সঙ্গে তাঁর অনেকগুলি সাক্ষাৎকার ঘটে এবং অবশেষে আরউইন-গান্ধী চুক্তি সম্পাদিত হয়। এরপর ২৯ আগষ্ট তারিখে তিনি কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে ইংল্যান্ডে গোল-টেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য রওনা হন। লণ্ডনে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাসে। ২৬ সেপ্টেম্বরে ল্যাঙ্কশায়ারের ডারওয়েনে মহিলা বস্ত্রশ্রমিকদের সাথে মিছিল করেন। অধিবেশন শেষ ৫ ডিসেম্বরে তিনি লণ্ডন ত্যাগ করেন। ২৮ ডিসেম্বরে বোম্বাই পোঁছুলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিনা বিচারে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিছুদিন পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১ লা জানুয়ারিতে কংগ্রেসর ওয়ার্কিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ইংরেজের সকল ধরনের রাজনৈতিক অত্যাচারের বন্ধ করার দাবি করা হয়। এবং সাতদিনের মধ্যে এই দাবি না মানলে, আইন-অমান্য আন্দোলন-এর হুমকি দেওয়া হয়। এই সূত্রে সরকার গান্ধীজী, জহরলাল নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, সুভাষ বসু-সহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে। উল্লেখ্য, এই সময় সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজার নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। ৭ এপ্রিল তিনি জেল থেকে ছাড়া পান। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি 'আইন-অমান্য অন্দোলন' প্রত্যাহার করেন। এই কারণে তিনি তীব্রভাবে সমালোচিত হন।

সাম্প্রদায়িক ভাগ-বাঁটোয়ারা সিদ্ধান্ত অনুসারে হরিজনদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা রহিতকরণের জন্য, ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি 'আমরণ উপবাস' শুরু করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর এই দাবি মেনে নিলে তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজি ও হিন্দিতে সাপ্তাহিক হরিজন পত্রিকা স্থাপিত হয়। ৮ই মে থেকে তিনি আত্মশুদ্ধির জন্য ২১ দিনের উপবাস শুরু করেন। এই রাত ৯টার সময় তিনি বিনাশর্তে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। ভারতের জন্য অহিতকর সরকারে সকল আদেশ প্রত্যাহরের জন্য ৯ মে থেকে ৬ সপ্তাহের জন্য আইন অমান্য আন্দোলন স্থগিত করেন। ২০শে মে তারিখে উপবাস ভঙ্গ করেন। ২৬শে জুলাই-তে তিনি সত্যাগ্রহ আশ্রম তুলে দেন। ৩০শে জুলাই তারিখে বোম্বাই সরকারকে জানান যে, ৩৩ জন অনুসারী নিয়ে আহমেদাবাদ থেকে রাস পর্যন্ত আইন অমান্য আন্দোলনের প্রচারণ চালাবেন। এই কারণে ৩১শে জুলাই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ই আগষ্ট থেকে অনশন শুরু করলে, ২৩শে আগষ্টে তাঁকে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। ৭ই নভেম্বর থেকে তিনি হরিজন উন্নয়নের কাজ শুরু করেন।

১৯৩৪ সালের গ্রীষ্মে তাকে হত্যার জন্য তিনটি ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়।১৭ সেপ্টেম্বরে এক ঘোষণায় তিনি জানান যে, ১লা অক্টোবর হতে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে পল্লি উন্নয়ন, হরিজন সেবা এবং বুনিয়াদী হস্তশিল্পের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করবেন। ২৬ অক্টোবর তিনি নিখিল ভারত পল্লি-শিল্প সমিতি উদ্বোধন করেন।
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে এপ্রিল থেকে মধ্য প্রদেশের সেবাগ্রামে বসতি শুরু করেন এবং এখানে তাঁর কর্মকেন্দ্র স্থাপন করেন। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে অক্টোবরে তাঁর সভাপতিত্বে বুনিয়াদী কারুশিল্পের মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। ইতিপূর্বে রাজকোটের তৎকালীন রাজা শাসন সংস্কারের কিছু অঙ্গীকার করেন এবং পরে তা কার্যকরী না করায়, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা মার্চ থেকে তিনি আমরণ উপবাস শুরু করেন। পরে ৭ই মার্চে ভাইসরয়ের হস্তক্ষেপে তিনি উপবাস ভঙ্গ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে গান্ধী, ১৯৪০
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে ভাইসরয়ের নিমন্ত্রণের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। অক্টোবর মাসে ব্যক্তিগত আইন অমান্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নীতিতে অটল থাকেন। সরকার সংবাদ প্রকাশের পূর্বে পাণ্ডলিপি পরীক্ষণ আদেশ দিলে, হরিজন ও সংশ্লিষ্ট সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর প্রকাশনা বন্ধ করে দেন।

১৯৪১ সালের মার্চ মাসে গান্ধী-আরউইন চুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুসারে সকল গণ অসহযোগ আন্দোলন বন্ধের বিনিময়ে সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয়। ৩০শে ডিসেম্বরে তাঁর অনুরোধে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জানুয়ারি থেকে হরিজন ও অন্যান্য পত্রিকার প্রকাশনা শুরু করেন। এই বৎসরে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপ্স ব্রিটিশ সরকারের শাসন সংস্কারমূলক প্রস্তাব নিয়ে ভারতে আসেন। ২৭শে মার্চ তাঁর সাথে ক্রিপ্সের আলোচনা হয়। ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া প্রস্তাব দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং প্রথম প্লেনে ক্রিপ্সকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। মে মাস থেকে শুরু হয়, 'ভারত ছাড়' আন্দোলন। ৮ আগষ্টে তিনি বোম্বাই-এ কংগ্রেস কমিটির অধিবেশন 'ভারত ছাড়' প্রস্তাবের ব্যাখ্যা দেন। এই কারণে ৯ই আগষ্টে তাঁকে গ্রেফতার করে পুনার আগা খান প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়।

১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারিতে তিনি ২১ দিনের উপবাস শুরু করেন। মার্চের ৩ তারিখে অনশন ভঙ্গ করেন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারিতে গান্ধীজীর পত্নী কস্তরবাই আগাখান প্রাসাদে মৃত্যবরণ করেন। ৬ই মে-তে তিনি বিনা শর্তে মুক্তি পান। সেপ্টেম্বর মাসের ৯ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে গান্ধীজীর আলাপ-আলোচনা হয়।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে এবং ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বঙ্গদেশ ও আসাম ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। এপ্রিল ও মে মাসে দিল্লী ও সিমলায় ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের সাথে রাজনৈতিক আলোচনা হয়। ১৬ই আগষ্টে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে নোয়াখালি জেলায় এবং বিহারে এই দাঙ্গা মারাত্মক রূপ লাভ করে। অক্টোবর মাসে নোয়াখালিতে তিনি কর্মস্থল স্থাপন করে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিতর মৈত্রী-স্থাপনের চেষ্টা করেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে তিনি বিহারে যান। ১৪-১৫ আগষ্টে ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে থাকলে, ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বরে জনগণের শুভবুদ্ধির আশায় তিনি উপবাস করেন।


১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জানুয়ারিতে দিল্লীতে গান্ধীজীর প্রার্থনা সভায় একটি বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। তবে এতে কেউ আহত হন নাই। ৩০ জানুয়ারি তারিখে, দিল্লীর বিরলা ভবনে (বিরলা হাউস) সান্ধ্যা প্রার্থনাসভায় শান্তির বাণী প্রচারের জন্য উপস্থিত হওয়ার প্রাক্কালে নাথুরাম বিনায়ক গোডসে নামক একজন হিন্দু মৌলবাদী তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।


সোমবার, ৫ আগস্ট, ২০১৯

হুমায়ূন আহমেদ জীবনী মূলক রচনা

bd-humayun-ahmed-biography

জন্ম ও ছেলেবেলা :– হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালে ১৩ ই নভেম্বর তৎকালীন পাকিস্থানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোনা মহুকুমার কেন্দুয়ারকুতুব পুরে জন্ম গ্রহণ করেন । তার পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ । তার পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন পিরোজ পুর মহকুমার এস ডি পি ও ( উপ - বিভাগীয় পুলিশ অফিসার ) হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন । তার পিতা সাহিত্য অনুরাগী মানুষ ছিলেন । তিনি পত্র পত্রিকায় লেখা লেখি করতেন । বগুড়া থাকার সময় তিনি একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন । গ্রন্থের নাম " দ্বীপ নেভা যার ঘরে "। তার মা'র লেখালেখির অভ্যাস না থাকলেও একটি আত্মজীবনী গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম " জীবন যে রকম " । পরিবারে সাহিত্যমনস্ক আবহাওয়ায় ছিল । তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক ; সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবিব রম্য সাহিত্যিক এবং কাঠুনিষ্ঠ । তার রচিত উপন্যাস থেকে জানা যায় যে ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান ; ডাকনাম কাজল । তার পিতা  ( ফয়জুর রহমান ) নিজের নামের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান । পরবর্তীতে আবার তিনি নিজেই ছেলের নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন । হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় , তার পিতা ছেলে মেয়ে দের নাম পরিবর্তন করতে পছন্দ করতেন । তার ছোট ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম আগে ছিল বাবুল এবং ছোটবোন সুফিয়ার নাম ছিল শেফালী । ১৯৬২ - ৬৪ সালে চ্ট্ট গ্রামে থাকাকালীন হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল বাচ্চু ।


শিক্ষা এবং কর্মজীবন :– তার পিতা চাকরি সূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছেন বিধায় হুমায়ূন আহমেদ দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখা পড়া করার সুযোগ পেয়েছন । তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন । তিনি পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে বি এস সি ( সম্মান ) ও এম এস সি ডিগ্রি লাভ করেন । তিনি মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ৫৬৪ নং কক্ষে তার ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন । পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন । ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন । এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তোমাদের জন্য ভালোবাসা রচনা করেন । ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন । লেখালেখিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ায় এক সময় তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন । শিক্ষক হিসেবে ছাত্র ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জন প্রিয় ছিলেন এই অধ্যাপক ।


সাহিত্যকৃতি :– সগৃহে বৈঠকি আড্ডায় হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র জীবনে একটি উপন্যাস রচনা রচনার মধ্যে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের শুরু । এই উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে । ১৯৭১–এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি । ১৯৭২ - এ কবি সাহিত্যিক  আহমেদ ছফার উদ্যেগে উপন্যাসটি খান ব্রাদাস কতৃর্ক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় । প্রখ্যাত বাংলা ভাষা শাস্ত্র পন্ডিত আহমেদ শরীফ সত্ব: প্রভৃও হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যমোদী মহলে কৌতুহল সৃষ্টি হয় । শঙ্খনীল কারাগার তার ২য় গ্রন্থ । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি  দুই শতাধিক গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস রচনা করেছেন । তার রচনার প্রধান কয়েককটি বৈশিষ্টের মধ্যে অন্যতম হলো – ' গল্প সমৃদ্ধি ' । এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্য ভাবে অতি বাস্তব ঘটনাবলীর অবতারনা করেন যাকে একরূপ যাদু বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা যায় । তার গল্প ও উপন্যাস সংলাপ প্রধান । তার বর্ননা পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রনের অদৃষ্ট পূর্ব প্রতিভা তার রয়েছে । যদিও সমাজচেতনার অভাব নেই তবু লক্ষ্যণীয় যে তার রচনায় রাজনৈতিক প্রণোদনা অনুপস্থিত । সকল রচনাতেই একটা প্রগাঢ শুভবোধ ক্রিয়াশীল থাকে ; ফলে ; নেতিবাচক ;

চরিত্রও তার লেখনীতে লাভ করে দরদী রূপায়ণ । এ বিষয়ে তিনি মার্কিন  লেখক  স্টেইনবেক দ্বারা প্রভাবিত । অনেক রচনার মধ্যে তার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং উপলদ্ধির প্রচ্ছাপ লক্ষ্য করা যায় । ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস মধ্যহ্ন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে পরি গণিত । এছাড়া জোছনা ও জননীর গল্প আর একটি বড়ো মাপের রচনা , যা - কিনা ১৯৭১ - এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বন করে রচিত । তবে সাধারনত তিনি সমসাময়িক ঘটনাবলি লিখে থাকেন ।



পারিবারিক জীবন :– হুমায়ূন আহমেদের প্রথমা স্ত্রীর নাম গুলতেকিন  আহমেদ । তাদের বিবাহ হয় ১৯৮৩ সালে । এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং এক ছেলে । তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ , নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ , এবং ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ । অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায় । ১৯৯০ সালে মধ্য ভাগ থেকে শিলার বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্টতা জন্মে । এরফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫ - এ গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ঐ বছরই শাওনকে বিয়ে করেন । এঘরে তাদের তিন ছেলে - মেয়ে জন্ম গ্রহণ করে । প্রথম ভুনিষ্ঠ কন্যাটি মারা যায় । ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন ।


ব্যক্তিগতজীবন :– জীবনের শেষ ভাগে ঢাকা শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমন্ডির ৩/এ রোড নিমিত দক্ষিণ হওয়া ভবনের একটি ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করছেনন । খুব ভোর বেলা ওঠা তার অভ্যাস ছিল তার , ভোর থেকে সকাল ১০ - ১১ অবধি লিখতেন তিনি । মাটিতে বসে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন  । কখনো অবসর পেলে ছবির আঁকতেন । জীবনের শেষ এক যুগ ঢাকার অদূরে গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলে ৯০ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত বাগান বাড়ী ' নুহাশ পল্লীতে ' থাকতে ভালোবাসতেন তিনি । তিনি বিবরবাসি মানুষ , তবে মজশিলী ছিলেন । গল্প বলতে আর রসিকতা করতে খুব পছন্দ করতেন । তিনি ভনিতাবিহিন ছিলেন । নিরবে মানুষের স্বভাব - প্রকৃতি ,আচার, আচরন , পর্যবেক্ষণ করা তার শখ । তবে সাহিত্য পরিমন্ডলের সঙ্গকিন রাজনীতি বা দলাদলিতে কখনো নিজেকে জড়িয়ে ফেলেননি । তিনি কিছুটা লাজুক প্রকৃতির মানুষ এবং বিপুল জনপ্রিয়তা সত্বেও অন্তরাল জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন । তবে নিঃসঙ্গতা খুব একটা পছন্দ করতেন না । কোথাও গেলে আত্মীয় - স্বজন , বন্ধু - বান্ধব  নিয়ে যেতে পছন্দ করতেন । বাংলাদেশে তার প্রভাব তীব্র ও গভীর ; এজন্য জাতীয় বিষয়ে ও সংকটে প্রায় তার বক্তব্য সংবাদ সমূহ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে থাকতো । অতুলনীয় জনপ্রিয়তা সত্বেও তিনি অন্তরাল জীবন যাপন করেন এবং লেখালেখি ও চিত্রনির্মাণের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন ।

চলচ্চিত্র নির্মাণ :– টেলিভিশনের জন্য একের পর এক দর্শক নন্দিত নাটক রচনার পর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯০ - এর গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন । তার পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র আগুনের পরশমনি মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে । ২০০০ সালে শ্রাবণ মেঘের দিন ও ২০০১ সালে দুই দুয়ারী চলচ্চিত্র দুটি প্রথম শ্রেণীর দর্শক দের কাছে দারুন গ্রহণযোগ্যতা পায় । ২০০৩ - এ নির্মাণ করেন চন্দ্রকথা নামে একটি চলচ্চিত্র । ১৯৭১- এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পেক্ষাপটে ২০০৪ সালে নির্মাণ করেন শ্যামল ছায়া চলচ্চিত্রটি । অতীত ২০০৬ সালে " সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র" বিভাগে একাডেমী পুরস্কার এর জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল । এছাড়াও চলচ্চিত্রটি কয়েকটি আন্তজার্তিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় । তার সব চলচ্চিত্রে তিনি নিজে গান রচনা করেন। ২০১২ সালে তার পরিচালনার সর্বশেষ ছবি ঘেটুপুত্র কমলা ( চলচ্চিত্র ) । এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র । এর মধ্যে ২০০৬ সালে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত দুরন্ত , বেলাল আহমেদ পরিচালিত নন্দিত নরকে এবং আবু সাইদ পরিচালিত নিরন্তর । ২০০৭ - এ শাহ আলম কিরণ পরিচালিত সাজঘর এবং তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র দারুচিনি দ্বীপ ।



কান্সার ও মৃত্যু :– ২০১১ - এর সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে ডাক্তারী চিকিৎসার সময় তার দেহে মলাশয়ের কান্সার ধরা পড়ে ।তিনি নিউইয়কের মেমোরিয়াল স্লয়ান কেটরিং কান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন । তবে টিউমার বাইরে ছড়িয়ে না পড়ায় সহজে তার চিকিৎসা প্রাথমিক ভাবে সম্ভব হলেও অল্প সময়ের মাঝেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় । ১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল । অস্ত্রোপচারের পর তাঁর কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও , শেষ মুহূর্তে শরীরের অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমন করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায় । কৃত্রিম ভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন । মলাশয়ের কান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই - এ স্থানীয় সময় ১১:২০ মিনিটে নিউ ইয়র্কের বেলেভু হাসপাতালে এই নন্দিত লেখক মৃত্যুবরণ করেন । তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয় । তার মৃত্যুতে সারা বাংলাদেশে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে অভূটপূর্ব আহাজারির সৃষ্টি হয় । তার মৃত্যুর ফলে  বাংলা সাহিত্যে ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয় ।


                        সমাপ্ত




রবিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৯

জগদীশচন্দ্র বসু জীবনী মূলক রচনা

jogodish-chandra-bosu-Biography

জগদীশচন্দ্র বসু পৃথিবী-বিখ্যাত এক বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম। বাংলাদেশের অতিপ্রাচীন জনপদ বিক্রমপুরে তাঁর পৈতৃক নিবাস। জগদীশচন্দ্র বসুর বাবা ভগবানচন্দ্র বসু এবং মা বামাসুন্দরী দেবী।
ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন শিক্ষিত, অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন্ন, আধুনিক ও স্বাধীনচেতা একজন মানুষ। ভগবানচন্দ্র বসু প্রথম জীবনে স্কুলে শিক্ষকতা করেন ময়মনসিংহের একটি বাংলা স্কুলে। এ ময়মনসিংহেই জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর। পরে ভগবানচন্দ্র বসু চাকরি নেন ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে।
ব্রিটিশ সরকারের চাকুরে এ ব্যতিক্রমী মানুষটি চাইতেন ছেলে বড় হয়ে অন্যের গোলাম হবে না। তাই তিনি ছেলেকে দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে মেলামেশার অবারিত সুযোগ করে দেয়ার জন্য স্কুল জীবনের শুরুতেই ভর্তি করান একটি সাধারণ বাংলা মাধ্যমের স্কুলে।
গ্রামের বাংলা মাধ্যমের এ স্কুলের শিক্ষাই যে তাঁর জীবনের ভবিষ্যতের পাথেয় হয়েছিল, সে অভিজ্ঞতার কথা জগদীশ বলেন,

'শৈশবকালে পিতৃদেব আমাকে বাংলা স্কুলে প্রেরণ করেন। তখন সন্তানদিগকে ইংরেজি স্কুলে প্রেরণ আভিজাত্যের লক্ষণ বলিয়া গণ্য হইত। স্কুলের দক্ষিণ দিকে আমার পিতার মুসলমান চাপরাসীর পুত্র এবং বাম দিকে এক ধীবরপুত্র আমার সহচর ছিল। তাহাদের নিকট আমি পশুপক্ষী ও জীবজন্তুর বৃত্তান্ত স্তব্ধ হইয়া শুনিতাম। সম্ভবত প্রকৃতির কার্য অনুসন্ধানে আমার অনুরাগ এইসব ঘটনা হইতেই বদ্ধমূল হইয়াছিল।'
ছোটবেলায় জগদীশের নিত্যদিনের সহচর ছিল একজন ডাকাত সর্দার। বালক জগদীশ প্রতিদিন ওই ডাকাতের কাঁধে চড়ে স্কুলে যায়, আবার স্কুল ছুটির পর ডাকাতের কাঁধে চড়েই বাড়ি ফিরে আসে। ছেলেবেলায় এ ডাকাত সর্দারের কাছ থেকে জগদীশ শোনেন তাঁর যৌবনের অনেক গল্পকথা। ডাকাত সর্দারের অসীম সাহসিকতার কাহিনী শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে বালক জগদীশের মন।
ফরিদপুরের সাধারণ বাংলা স্কুলে ৫ বছর পড়ার পর ১০ বছর বয়সে জগদীশ চলে আসেন কলকাতায়। প্রথমে ভর্তি হন হেয়ার স্কুলে। পরে ভর্তি হন কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। এ স্কুল থেকে ১৮৭৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। এর পর তিনি ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এ কলেজেই শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়ে যান পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার লাফোঁকে। পদার্থবিজ্ঞানের দুরূহসব তত্ত্বকে খুব সহজে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করাতে ফাদার লাফোঁর জুড়ি ছিল না। তাছাড়া নতুন শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী করে গড়ে তুলতেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জগদীশচন্দ্র ফাদার লাফোঁর সাহচর্যেই পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
১৮৭৭ সালে এ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং ১৮৮০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন।


১৮৮১ সালের জানুয়রি মাসে ক্যামব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে প্রকৃতিবিজ্ঞানে ভর্তি হন জগদীশ। এ কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক লর্ড র‌্যালে, শারীরতত্ত্ববিদ মাইকেল ফস্টার, ভ্রূণতত্ত্ববিদ ফ্রান্সিস বালফুর, ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হাগস, শারীরতত্ত্ববিদ ফ্রান্সিস ডারউইন, অধ্যাপক ভাইনসের মতো পৃথিবী-বিখ্যাত বিজ্ঞানীর সংস্পর্শে জগদীশ বিজ্ঞানে আরও অধিক উৎসাহী হয়ে ওঠেন।

১৮৮৪ সালে লন্ডনের পড়ালেখা শেষ করে জগদীশ দেশে ফিরে আসেন শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের অভিপ্রায়ে। ১৮৮৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু এ পদে তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হলো একজন ইউরোপীয় সহকারী অধ্যাপকের এক-তৃতীয়াংশ। সমযোগ্যতাসম্পন্ন একজন ভারতীয়ের বেতন একজন ইউরোপীয়র এক-তৃতীয়াংশ_ জগদীশের পক্ষে এ অন্যায় মেনে নেয়া ছিল অসম্ভব। খুব স্বাভাবিকভাবেই জগদীশ ব্রিটিশদের এ অপমানজনক নিবর্তনমূলক নিয়ম মেনে নেননি। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি। বিনা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন জগদীশ। দীর্ঘ ৩ বছর নিরবচ্ছিন্ন প্রতিবাদে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয় ব্রিটিশরা। ভারতীয়দের জন্য অমর্যাদাকর নিয়ম রহিত করে ১৮৮৮ সালে। তিন বছরের পাওনা একসঙ্গে পরিশোধ করে ব্রিটিশ সরকার।

প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি জগদীশ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা শুরু করেন। অল্পদিনেই তিনি সাফল্য পান। অতিক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট আলোর ধর্ম এবং তা উৎপাদন ও ধরার যন্ত্র উদ্ভাবন করেন তিনি। ১৮৯৫ সালের ১ মে এশিয়াটিক সোসাইটির এক সম্মেলনে গবেষণা প্রবন্ধ পাঠ করেন তিনি। একই বছর কলকাতার টাউন হলে এক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। এ প্রদর্শনীতে তিনি তাঁর উদ্ভাবিত মাইক্রোওয়েভ দিয়ে লোহার গোলা নিক্ষেপ করেন, পিস্তলের আওয়াজ ফোটান এবং বারুদস্তূপ উড়িয়ে দিতে সক্ষম হন।
বলাবাহুল্য, জগদীশের এ প্রদর্শনীই বর্তমানের রাডার প্রযুক্তির প্রাথমিক ধাপ। জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভাবিত এ মাইক্রোওয়েভ দিয়ে বিনা তারে সংবাদ প্রেরণ করা সক্ষম ছিল। কিন্তু জগদীশ চেয়েছিলেন এ তরঙ্গের আরও বহুমুখী ব্যবহার।

১৮৯৬ সালের ২৪ জুলাই বোম্বে থেকে জাহাজে করে জগদীশ লন্ডনের উদ্দেশে রওনা করেন। ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তৃতা প্রদান করেন। এদিন বক্তৃতাস্থলে উপস্থিত ছিলেন জেজে থমসন, অলিভার লজ, লর্ড কেলভিন প্রমুখ। এটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর প্রথম বক্তৃতা।

জগদীশের এ বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানের রাজ্যে বাঙালির যাত্রা শুরু। জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম বাঙালি বিজ্ঞানী, যাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশকে বিজ্ঞানের অঙ্গনে সুপরিচিত করে তোলে। বক্তৃতা শেষে লর্ড কেলভিন ও অলিভার লজ জগদীশচন্দ্রকে ইংল্যান্ডে থেকে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু জগদীশ রাজী হননি।
জগদীশের প্রায় একই সময় মাইক্রোওয়েভ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ইতালির বিজ্ঞানী মার্কোনি। ১৯০২ সালে, জগদীশের প্রায় ৭ বছর পর মার্কোনি আটলান্টিকের অপর পারে বিনা তারে বার্তা প্রেরণে সক্ষম হন। তত দিনে জগদীশ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা ছেড়ে উদ্ভিদবিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেছেন। তিনি উদ্ভিদের স্নায়ু, স্বতঃস্পন্দন, আবেগ, অনুভূতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

তাঁর এসব গবেষণার মূলে রয়েছে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে ঐক্যের সম্বন্ধ স্থাপন। প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে এ ঐক্য অন্বেষণ করতে গিয়ে জগদীশ প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বৃক্ষের স্নায়ু আছে। এটি প্রমাণ করতে গিয়ে জগদীশকে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীদের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। একজন পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে উদ্ভিদবিজ্ঞানে তাঁর এ গবেষণাকে অনেকে দেখেছেন অনধিকারচর্চা হিসেবে। কিন্তু জগদীশ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে এ বিভেদ মানতে রাজি নন। তাই জগদীশ বলেন, 'পাশ্চাত্য দেশে জ্ঞানরাজ্যে এখন ভেদবুদ্ধির অত্যন্ত প্রচলন হইয়ছে। সেখানে জ্ঞানের প্রত্যেক শাখা-প্রশাখা নিজেকে স্বতন্ত্র রাখিবার জন্যই বিশেষ আয়োজন করিয়াছে; তাহার ফলে নিজেকে এক করিয়া জানিবার চেষ্টা এখন লুপ্তপ্রায় হইয়াছে। জ্ঞান-সাধনার প্রথমাবস্থায় এরূপ জাতিভেদ প্রথায় উপকার করে, তাহাতে উপকরণ সংগ্রহ করা এবং তাহাকে সজ্জিত করিবার সুবিধা হয়; কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত যদি কেবল এই প্রথাকেই অনুসরণ করি তাহা হইলে সত্যের পূর্ণমূর্ত্তি প্রত্যক্ষ করা ঘটিয়া উঠে না; কেবল সাধনাই চলিতে থাকে, সিদ্ধির দর্শন পাই না।'

জগদীশ দৃঢ়তার সঙ্গে উদ্ভিদবিজ্ঞানে তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থার যে ধারা, তার বিপরীতে তিনি গড়ে তোলেন সম্পূর্ণ নতুন এক ধারা। জগদীশের এ গবেষণার মধ্য দিয়ে আন্তঃবিষয়ী গবেষণার এক অভিনব ধারার দ্বার উন্মোচিত হয়, যার নাম জৈবপদার্থবিজ্ঞান। জগদীশ হয়ে ওঠেন এ ধারার পথিকৃৎ। ইতিহাসে জগদীশচন্দ্র বসু হয়ে ওঠেন প্রথম জৈবপদার্থবিজ্ঞানী।

জগদীশচন্দ্র বসুর উদ্ভাবিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো এতই অভিনব যে, তখনকার বিজ্ঞানীদের পক্ষে তা মেনে নেয়া খুব সহজ ছিল না। এ কারণে তাঁর প্রতিটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য উপযুক্ত যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রসামগ্রী তৈরির জন্য কোনো রকমের আধুনিক প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা তাঁর ছিল না। তাই টিনের পাত, লোহার চাকতি, কাঠের টুকরা ইত্যাদি অব্যবহৃত অকেজো বস্তুসামগ্রী দিয়ে নিজে সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সাধারণ কামার-মিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করিয়ে নিতে থাকলেন বিজ্ঞান গবেষণার আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। এভাবেই তিনি একে একে তৈরি করেন ৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বিদ্যুৎ তরঙ্গ সৃষ্টির যন্ত্র, কোহেরার, কালেকটিং ফানেল, হর্ন এন্টেনা, সমাবর্তক (চড়ষধৎরংবৎ) ও বিশ্লেষক যন্ত্র (অহধষুংবৎ), স্ট্রেন সেল, চৌম্বক-লিভার রেকর্ডার, রেজোন্যান্ট রেকর্ডার, ইলেকট্রিক প্রোব, ফাইটোগ্রাফ, শোষণগ্রাফ (ফটোগ্রাফ), স্বয়ংক্রিয় ফটোগ্রাফ, বাবলার ইনস্ট্রুমেন্ট, প্লান্ট সিসমোগ্রাফ, ক্রেসকোগ্রাফ, চৌম্বক ক্রেসকোগ্রাফ, স্বয়ংক্রিয় ফটোসিনথেসিস রেকর্ডার ইত্যাদি। শোনা যায়, তিনি দুই শতাধিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেন।

জগদীশ যখন পৃথিবী-বিখ্যাত বিজ্ঞানী, রবীন্দ্রনাথ তখন অপার সম্ভাবনার এক তরুণ কবি। ১৮৯৭ সালে ইউরোপ জয় করে বিজয়বেশে জগদীশ যখন কলকাতায় ফিরে আসেন, তখন রেলস্টেশনে তাঁকে অভিবাদন জানাতে উপস্থিত ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আনন্দমোহন বসু প্রমুখ। এর কিছুদিন পরে পৃথিবী-বিখ্যাত এ বিজ্ঞানীকে শুভেচ্ছা জানাতে ছুটে যান স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে না পেয়ে শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে রেখে আসেন একগুচ্ছ ম্যাগনোলিয়া ফুল আর একটি চিঠি। এর কয়েক দিন পর রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন 'জগদীশচন্দ্র বসু' শিরোনামের একটি কবিতা। এর পর থেকে তাঁদের বন্ধুত্ব শুরু। রবীন্দ্রনাথ যেমন উৎসাহ দিয়ে বন্ধুর বিজ্ঞান গবেষণায় উজ্জীবিত রাখেন, জগদীশও তেমনি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করে তোলেন।

ইউরোপে জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য অনুবাদ করে তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুদের পড়ে শোনাতেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চিঠিতে জগদীশ বলেন, 'তোমার পুস্তকের জন্য আমি অনেক মতলব করিয়াছি। তোমাকে যশোম-িত দেখিতে চাই। তুমি পল্লীগ্রামে থাকিতে পারিবে না। তোমার লেখা তর্জমা করিয়া এদেশীয় বন্ধুদিগকে শুনাইয়া থাকি, তাঁহারা অশ্রুসম্বরণ করিতে পারে না। তবে কী করিয়া ঢ়ঁনষরংয করিতে হইবে, এখনও জানি না। চঁনষরংযবৎ-রা ফাঁকি দিতে চায়।' জগদীশ চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লে উঠে আসুক; রবির আলোয় সারা পৃথিবী আলোকিত হোক। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এক অপূর্ব সেতুবন্ধন হয়েছিল এ দুই মহান ব্যক্তির বন্ধুত্বের মাধ্যমে।

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে জগদীশের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা সফল হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের এ নোবেল বিজয়ে জগদীশের তাই আনন্দের সীমা-পরিসীমা রইল না। এ অনুভূতিতে জগদীশ লেখেন, 'পৃথিবীতে তোমাকে এতদিন জয়মাল্য ভূষিত না দেখিয়া বেদনা অনুভব করিয়াছি। আজ সেই দুঃখ দূর হইল। দেবতার এই করুণার জন্য কি করিয়া আমার কৃতজ্ঞতা জানাইব? চিরকাল শক্তিশালী হও, চিরকাল জয়যুক্ত হও। ধর্মর্ তোমার চিরসহায় হউন।'
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে যে অভিনন্দন জ্ঞাপন করা হয়, তার সভাপতি ছিলেন স্বয়ং জগদীশচন্দ্র বসু।
১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর নিজের ৫৯তম জন্মদিনে কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিজ দেশে একটি বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হয়।
জগদীশ তাঁর জীবদ্দশায় অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।
১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ভারত সরকার তাঁকে সিআইই (ঈযধসঢ়রড়হংযরঢ় ড়ভ ঃযব ওহফরধহ ঊসঢ়রৎব) উপাধি, ১৯১২ সালে জগদীশ সিএসআই (ঈড়সঢ়ধহরড়হংযরঢ় ড়ভ ঃযব ংঃধৎ ড়ভ ওহফরধ) উপাধি, ১৯১৭ সালে নাইট উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ১৯২৬ সালে বেলজিয়ামের রাজা জগদীশচন্দ্র বসুকে রাজকীয় কমান্ডার অব দি অর্ডার অব লিওপোল্ড উপাধিতে ভূষিত করেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।
এছাড়া ১৯২০ লন্ডন রয়েল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। পৃথিবীর যে কোনো বিজ্ঞানীর জন্যই এটি একটি বিরাট স্বীকৃতি। জগদীশচন্দ্র বসুই হলেন ভারতবর্ষের প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৯ সালে দশমবারের জন্য ইউরোপ যাত্রা করেন এবং ফিনল্যান্ডের বিজ্ঞান সমিতি কর্তৃক সংবর্ধিত হন।

১৯৩৭ সালের ২ নভেম্বর রায়বাহাদুর এএন মিত্রের আমন্ত্রণে সস্ত্রীক গিরিডি যাত্রা করেন। ২৩ নভেম্বর সকাল ৮টায় গিরিডিতে হঠাৎ বাথরুমে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। ২৪ নভেম্বর ভোর ৪টা ১২ মিনিটে গিরিডিতে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর মরদেহ নিয়ে আসা হয় বসু বিজ্ঞান মন্দিরে। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে মরদেহ নিয়ে শেষ যাত্রা শুরু হয়; আর পার্ক সার্কাস ক্রিমেটরিয়ামে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
জগদীশের আজন্ম সাধনা ছিল সত্য অনুসন্ধান। জগদীশ জানতেন সত্যই জ্ঞান। জগদীশ মনে করতেন কবি, ঋষি, বিজ্ঞানী সবাই জ্ঞানের সাধক, সত্যের সাধক। কবি ও বিজ্ঞানীর সত্য অনুসন্ধিৎসার প্রসঙ্গে জগদীশ বলেছেন, 'বৈজ্ঞানিক ও কবি, উভয়েরই অনুভূতি অনির্ব্বচনীয় একের সন্ধানে বাহির হইয়াছে। প্রভেদ এই, কবি পথের কথা ভাবেন না, বৈজ্ঞানিক পথটাকে উপেক্ষা করেন না।'

জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানের পথেই সত্য অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন। এ কারণেই তিনি 'বিশ্বাসের সত্য'কে 'বিজ্ঞানের সত্য' দিয়ে যাচাই করে এ দুয়ের ব্যবধান ঘোচাতে চেয়েছেন। বালক বয়সে জগদীশ চেয়েছিলেন উঁচু-নিচুর ব্যবধান ঘোচাতে। তরুণ বয়সে চেয়েছিলেন শাসক আর শোষিতের ব্যবধান ঘোচাতে। পরিণত বয়সে জগদীশের এ চেতনাই যেন পরিপক্ব হয়ে আরও উন্নত হয়ে ধরা দিয়েছিল তাঁর গবেষণায়। এ কারণেই তিনি ঘোচাতে চেয়েছেন পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের ব্যবধান, বিজ্ঞান-সাহিত্যের ব্যবধান, উদ্ভিদ-প্রাণীর ব্যবধান, এমনকি সপ্রাণ-অপ্রাণের ব্যবধানও। জগদীশের আজন্ম সাধনা ছিল এ ব্যবধান ঘোচানো। এ ব্যবধান ঘোচাতে গিয়ে জগদীশ সাফল্যের এমন এক গগনচুম্বী উচ্চতায় আরোহণ করেছেন, যেখানে খুব কম লোকের পক্ষেই যাওয়া সম্ভব। পৃথিবীর অসাধারণ সফল মানুষের মধ্যেও জগদীশ আলাদা। বাঙালির মধ্যে জগদীশ অনন্য, সবার চেয়ে এগিয়ে। এ কারণেই জগদীশ আজও প্রাসঙ্গিক, জগদীশ আজও গুরুত্বপূর্ণ।